Search This Blog

Total Pageviews

Tuesday, January 8, 2019

কিশোর উপন্যাস - ক্যামেরা

bangla novel for teen- boy with a camera


অবশেষে! 
অবশেষে হলো!
টিটোর আরাধ্য বস্তু লাভ হলো! সেই ক্লাস এইট থেকে এই স্কুল-ফাইনাল পর্যন্ত যা প্রাপ্তির সাধনায় বেচারা টিটো কতো কাতরতা, কতো আকুলতা, কতো আবেদন নিবেদন করেছে, এতো দিনে সে প্রাপ্তি তার ঘটলো।
কি বলছো? ঈশ্বরপ্রাপ্তি? না, ঈশ্বর অবশ্য নয়, কিন্তু তার চাইতে কমও কিছু নয়। অন্ততঃ টিটোর কাছে। সৃষ্টিকর্তাকে পাবার বাসনায় আর বেশি কী করতে পারে মানুষ? সৃষ্টিকর্তাকে চায়নি টিটো, চেয়েছিলো একটা ক্যামেরা! হ্যা নিজের নিজস্ব একট৷ ক্যামেরা। আর তার জন্যে কী না করেছে টিটো-মানে আর কি, অবিভাবকদের পায়ে তেল দেওয়ার ব্যাপারে! যতো যা করবার সবই করেছে, সেই ক্লাস এইট থেকে আবেদন-যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এতোদিনে সিদ্ধ হলো মনস্কামনা।
হোক এক কুচি একটু বক্স ক্যামেরা, হোক তার নতুন দাম মাত্র পয়ত্রিশ টাকা, আর বলুক না নতুন কাকা, পয়ত্রিশ টাকার ক্যামেরা, ক্যামেরা না বলে, বল টিনের কৌটো! তবু ক্যামেরা তো। তাতে ফিল্মতো পরানো যায়, এই বেশি। এই-ই টিটোর কাছে লাখ টাকার সম্পত্তি। এতেই ফটো তুলে টিটো একেবারে তাক লাগিয়ে দেবে সকলকে। ক্যামেরার সাধ তো তার শুধুই সাধ মাত্র নয়, ওই সাধের পিছনে লুকিয়ে আছে একটি শোচনীয় ইতিহাস।
আরে না না, একথা ভেবো না   টিটোর কোনো প্রাণের বন্ধু নিরুদ্দেশ হয়ে চলে গিয়ে দাগা দিয়ে গেছে টিটোকে, একখানি ফটোর দাগ পর্যন্ত না রেখে। আর সেই দুখে টিটো সঙ্কল্প করেছে তার একশো জন বন্ধুর মধ্যে বাকি নিরানব্বই জনের ফটো তুলে অ্যালবামে সেঁটে রেখে দেবে।
না, আসলে এ ধরনের কিছু ন। টিটোর মনে যে গভীর দাগ, সে হচ্ছে অপমানের। সেই ক্লাস এইট থেকে সেই অপমানের জ্বালা নিয়ে বেড়াচ্ছে টিটো। ঘটনাটা তাহলে বলেই ফেলি।
সে সময়, অর্থাৎ ক্লাস এইটের সময় টিটোর বড় আপুর সবে নতুন বিয়ে হয়েছে। জামাইবাবু আসছেন মাঝে মাঝে, আর বাড়িসুদ্ধ সকলে সেই নতুন জামাইয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছে। এমন জামাই নাকি হয় না। জামাই-জনোচিত সমস্ত গুণই নাকি তার সর্বাঙ্গে বিকশিত হয়ে আছে! কিন্তু সত্যি বলতে কি টিটোর দুচোখের বিষ লাগতো ওই জামাইবাবুকে।
কেন? কারণটা কি? কারণ বলতে গেলে গুছিয়ে বলা শক্ত। তবু বলা যায়, জামাই বাবুকে বড় বেশি মাতব্বর মনে হতো টিটোর। সর্বদাই তার কেমন যেন বিশ্বজ্ঞানী ভাব। আর টিটোকে তো সত্যি সত্যিই প্রত্যেক ব্যাপারে অপমান করছেন। এলে পরে ঢুকেই প্রথম ব্যঙ্গ হাসি এই যে মার্শাল টিটো, কি খবর আপনার? ঘুড়ি ওড়ানোটি চলছে তো?
কেন রে ভাই, ঘুড়ি ওড়ানো ছাড়া আর কিছু করে না নাকি টিটো? আর টিটোর বয়সী কোন ছেলেটাই বা ঘুড়ি না ওড়ায়? তা সে যাক। ক্যামেরার কথাটাই হোক।
সেবারে মাতব্ব(জামাই) মশাই শ্বশুরবাড়ি এলেন এক ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে। সকলের ফটো তুলবেন নাকি। যেন টিটোদের ত্রিসীমানায় ষ্টুডিও নেই, যেন এযাবৎ টিটোদের বাড়ির সমস্ত দেয়াল শূন্য সাদা খাঁখাঁ করছে, একখানিও ছবি ঝুলছে না তাতে!
রাগে জলে গিয়েছিলো টিটো কিন্তু আশ্চর্যের কথা, এই ক্যামেরা নায়, জামাইয়ের খাতির যেন আরো চতুর্গুণ বেড়ে গেলো আর বাড়িশুদ্ধ, সবাই এমন হ্যাংলার মতো জামাই বলা মাত্রই ক্যামেরার সামনে দাড়িয়ে পড়তে লাগলো যে দেখে মনে হতে পারে, অভাগারা জীবনে কখনো ক্যামেরার সামনে দাড়ায়নি। আর কিছু না, জামাইয়ের গৌরব বাড়িয়েই যেন তাদের পরমার্থ।
টিটোই শুধুই ছিলো অবিচলজামাইবাবু যেই তার সেই পেটেন্ট করা ব্যঙ্গ হাসিটি হেসে ডাক দিলেন, এই যে মার্শাল টিটো, আসুন আপনার একখানা হয়ে যাক। তখন টিটো সঙ্গে সঙ্গে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জবাব দিলো কী হবে ছবি তুলে? দেয়ালে কি আর জায়গা আছে?
তা কোথায় লজ্জিত হবি, তা নয়, জামাইবাবু হো হো করে হেসে উঠে বলে উঠলেন, দেয়ালে ফটো কি আর ভদ্রলোকে টাঙায় আজকাল? ও তো উনবিংশ শতাব্দীর ফ্যাশন। অ্যালবাম আছে কি করতে? এই যে আমি ছবিগুলো তুলছি, এর প্রত্যেকটির এক একখানি এনলার্জ কপি তোমার বড় আপুর অ্যালবামে থাকবে। বুঝলে? মানে আর কি শ্বশুরবাড়িতে থাকার সময় মন কেমন করলেই খাতা খুলে বাপের বাড়ির আদি অন্ত সবাইকে দেখতে পাবে তোমার বড় আপু। কী ফাইন অ্যালবাম কিনে দিয়েছি।
কিন্তু টিটো এলো না।
আমার জন্যে কারুর মন কেমন করবে না --বলে গটগট করে চলে গেলে টিটো। ওসব ঢং তার সহ্য হয় না কিন্তু ফের আবার। জামাইবাবুর ঝুলোঝুলি, এসো এসো করে, অথচ টিটোও কাঠ কবুল! জামাইবাবুর ওই ফিকফিকে হাসি, গিলে কোচানো মিহি আদ্দির পাঞ্জাবি, কাঁচির পাজামার মাটিতে লোটানো কোচা সবই টিটোর চক্ষুশূল। তদুপরি হচ্ছে চেহারা। পুরুষ মানুষের এতো ফর্সা হবার দরকার কি আছে, ভাই ? টিটোর তো দুচোখের বিষ। ওর মনে হয়, বেটাছেলে ফর্সা হলেই তাকে কেমন বোকা বোকা লাগে। সেই কথাটা সেদিন হঠাৎ সে বলেও ফেলেছিলো। আর সঙ্গে সঙ্গে জামাইবাবু বলেছিলেন, হ্যা, যেমন রবীন্দ্রনাথ, যেমন সুভাষচন্দ্র, যেমন--আর যেমন। আরোটা কি, সে আর শোনবার ধৈর্য হয়নি টিটোর, ছিটকে সরে গিয়েছিলো সে।
মোট কথা, প্রতিপদে টিটোই অপদস্থ হচ্ছিলো জামাইবাবুর কাছে, তাকে অপদস্থ করতে পারছিলো না কিছুতেই। তাই জামাইবাবুর এই ছবি তোলার ডাক প্রত্যাখ্যান করে বেশ একটু আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিলো টিটো। আমার ছবি কাউকে তুলতে হবে না, বলে। শেষে যখন গটগট করে চলে এসেছিলে টিটো তখন জামাইবাবুর মুখটা কি আর কালো হয়ে চুপসে যায়নি? কিন্তু তারপর যা ঘটলো, সে এক অদ্ভুঘটনা!
বড় আপুরর সেই বিখ্যাত অ্যালবাম ভর্তি করার পর দেখা গেলো তার পাতায় পাতায় টিটোর ছবি। ঈশ্বর জানেন, কখন কোন মহা মুহুর্তে টিটোর অজ্ঞাতসারে এই সব ছবি তোলা হয়েছে। হা, মহামুহুর্তেই, কারণ সে ছবি দেখে বাড়িসুদ্ধ লোক হেসে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। টিটো খালিগায়ে হাফ প্যান্ট পরে দাড়িয়ে আছে। টিটো চোখমুখ কুঁচকে হাচি দিচ্ছে, টিটো ইয়া বড়ো হাঁ করে হাই তুলছে, টিটো আড়ামোড়া ভাঙছে, ঘুম থেকে উঠে একচোখ বুজে চোখ রগড়াচ্ছে, টিটো। স্কুলের তাড়ার সময় আধপোয়া ওজনের একটি ভাতের গ্রাস মুখে তুলছে, এই সব ছবি! বাড়ির আর সবার ছবি দু-একখানা করে, টিটোর কমছে কম বিশখানা !
আশ্চর্য! টিটোর এই লাঞ্ছনায় টিটোরই বাড়ির লোকের কী স্ফূর্তি। অদ্ভুত বিদঘুটে এই পৃথিবী। কারুর অপদস্থতাতেই অন্যে সুখ! জামাইবাবুর হাসিটাও যাচ্ছে তাই রকম বিদঘুটে। সেই বিদঘুটে হাসি হেসে তিনি টিটোকে বলেন, দেখলে তো শালাবাবু, তুললাম কিনা তোমার ছবি? অহঙ্কার না করলে ভালো ছবিই হতো তোমার।
ভালো ছবিতে দরকার নেই আমার, বলে চলে এসেছিলো টিটো কিন্তু পিছনে সে কী সমবেত হাস্যনিজেদের ছেলেমেয়ে অপদস্থ হলে লোকে কি করে যে এতো স্ফূর্তি পায়, টিটোর বুদ্ধির তা অগম্য।
যাক সেইদিন টিটো প্রতিজ্ঞা করেছিলো জামাইবাবুকেও একবার দেখে নেবে সে। মানে আর কি দেখিয়ে দেবে সবাইকে। হলোই বা জামাই সাজা নাড়ুগোপাল, হা করে হাইও তো তোলেন কখনো সখনো! আর খেতে বসে গালের চামড়া কুঁচকে যখন মুরগি পা চিবান, তখন কিছুমাত্র সুন্দর দেখায় না। দুপুরবেলা চর্বচোষ্য খাওয়ার পর যখন হাত-পা বিছিয়ে শুয়ে নাক ডাকান তখনই বা কী মনোরম লাগে? আর কোনো কায়দায় যদি একমুঠোস্যি নাকের সামনে এগিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সেই অপূর্ব হাচি দেয়া মুখ খানিও তো, ক্যামেরার মাধ্যমে অবিনশ্বর করে রাখা যায়!
সবই যায়, শুধু যদি একটি ক্যামেরা থাকে নিজের নিজস্ব। তদবধি টিটোর ক্যামেরার বায়না।
কিন্তু টিটোর গার্জেনরা এমনই হাদয়হীন, আর টিটোর ভাগ্য এমনই যে, তুচ্ছ একটা পয়ত্রিশ টাকার জিনিস পেতে এতোদিন লাগলো। জামাইবাবু কি আর এখন ততো ঘন ঘন আসেন! যাক তবুও মন্দের ভালো। তবু তো হলো। জিনিসটা কিনে দিলেন ছোটকাকা। বললেন, এই নে, আনলাম কিনে। অনেক দিনের বাসনা তোর, অনেকদিনের শখ, দিলাম মিটিয়ে।
আমার ছেলেবেলায় একটা পার্কার পেনের শখ ছিলো, তা দিয়েছিলেন আমাকে আমার ছোটোমামা আমার ম্যাট্রিকের রেজাল্ট দেখে খুশি হয়ে। তা তোর এই স্কুল ফাইনালের রেজাল্ট বেরোলো, মুচকি হেসে বললেন ছোটকাকা, প্রাইজ দেওয়াটা কে বলতে পারে ঠাট্টার মতন দেখাবে কিনা। আর কে বলতে পারে, তুই তখন সন্নাসী টন্নাসী হয়ে যাবি কিনা তার চাইতে এখনই ভলো, কি বলিস! মানে এই আড়াই-তিন মাসই তো তোদের মতো ছেলেদের সুখের কাল। নে মিটিয়ে নে সাধ বাসনা হেসে খেলে নে এই বেলা।
আজ পর্যন্ত বুঝতে পারে না টিটো সংসারসুদ্ধ বড়োরা ছোটোদের সঙ্গে বিদ্রুপ করে এতো সুখ পায় কেন? কই ছোটোরা তো তোমাদের ব্যাপারে কিছু বলতে যায় না? বলতে গেলে তোমাদের কী অবস্থা হতো, সে কথা খেয়াল করেছে কখনো? তোমরা যে নিজেরা কতো অদ্ভূত কিম্ভুত আর হাস্যকর তা জানো না তাই। আর সেটা ছোটোদের চোখেই বেশি ধরা পড়ে। ছোটোদের দয়ার শরীর, তাই সেটা জানিয়ে দেবার চেষ্টাও করে না। কিন্তু যদি করতো ?
যাক ও তো চিরকালের দুঃখ। বড়োরা চিরদিনই হিংস্র আপাততঃ নতুন করে আর একটু দুঃখের সৃষ্টি হলো টিটোর। দিচ্ছো একটা উপহার, তা ভালো মনে দাও না বাবা, তা নয় সাত সতেরো হাড় জ্বালানো কথা। জিনিসটা নেহাত যদি ক্যামেরা না হয়ে আর কিছু হতো, নিশ্চয় টিটো ও আমার দরকার নেই বলে তাচ্ছিল্য দেখিয়ে চলে যেতো, কিন্তু জিনিসটা ক্যামেরা। তাই পারলো না। প্রাণ রে বলতে পারলো না আমার দরকার নেই আকুল আগ্রহে নিলো হাত পেতে।
আর সত্যি বলতে জিনিসটা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সারাজীবনের মতো না পাওয়ার দুঃখ ভুলে গেলে টিটো। তার মনে হলো, সে যেন একটা সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হলোছোট কাকা!
কি রে?
ফিল্ম পরানো আছে?
দূর ফিল্ম কি আর পরানো থাকে? এনে পরাতে হবে।
কবে আনবে ছোটকাকা?
কবে আনবো? ও আর কি, আনলেই হলো। ঘোড়া যখন হয়েছে চাবুকও হবে।
আর বেশি জ্বালাতন করতে সাহস হয় না টিটোর। শুধু ভাবে ঘোড়া হতে বছর চারেক লেগেছে, এখন চাবুক পেতে কতো দিন লাগবে, কে জানে। একত্রে ঘোড়া আর চাবুক দুই-ই আনলে কী এমন হতো?
কীভাগ্য, দিন আষ্টেক আবেদন নিবেদনেই হলে কাজ। এলো ফিল্ম।
ছোটকাকাই এনে দিলেন।
কিন্তু তারপর?
তারপর ছোটকাকা ক্যামেরায় ফিল্মটা বেশ জুত করে বসিয়ে দিয়ে বললেন, দাড়া দেখিয়ে দিই।
ব্যস, সেই যে তিনি দেখাতে শুরু করলেন, সমস্ত রোলটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়লেন না। টিটো যতোবারই আকুল আগ্রহে, আমি একটু দেখি বলে হাত বাড়াতে যায়, ছোটকাকা ততোবারই,আঃ! বলে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, তোরই তো থাকবে বাপু, জিনিসটা কেমন, দেখতে দে।
দেখতে দেওয়া মানে, যা ইচ্ছে ছবি তুলে নেওয়া। রাস্তার একটা ছাগলছানারই ছবি তুলে নিলেন ছোটকাকা। চিরকালের বুড়ি মাজেদের মা চিরকুট্টি ময়লা কাপড় পরে বাসন মাজছে, তারও নেওয়া হয়ে গেলো একটা। যা দেখছেন তাই তুলছেন। মরিয়া হয়ে অবশেষে একবার বলে ওঠে টিটো, একটা আমি তুলি,ছোটকাকা!
তুলবি? ছোটকাকা অমায়িক হাসি হেসে বলেন, কিন্তু ফিল্মে সব কটাই তো খরচা হয়ে গেলো রে, এখন আর নিয়ে কি করবি? বলে সহাস্য মুখে ক্যামেরাটা তুলে রাখেন ড্রয়ারে। চাবি দিতেও ভোলেন না।
এখন হাত দিসনি খারাপ হয়ে যাবে, এ রোলটা প্রিন্ট করতে দিয়ে আসবে, তখন এনে দেবো। র একটা রোল। ক্যামেরা কেনা মানেই হাতি কেনা, এই হচ্ছে কথা। ফিল্ম রে, প্রিন্ট রে, ভালো হলো তো করাও এনলার্জ, নানাখানা! এই তো মিনিটের মধ্যে কতোগুলো পয়সা গেল। যা দাম হয়েছে আজকাল রোলগুলোর ।
টিটোকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুনতে হলো এই উপদেশ অমৃত।  উত্তর দেবার উপায় নেই, যেহেতু সে ছোটো। এ বাড়িতে ওপর ওলাদের মুখের ওপর কথা বলা নাকি মহাপা!
দেখা যাক মার কাছ থেকে পয়সা বাগিয়ে কিছু করা যায় কিনা! যাক তা তো হলো, না হয়, কিন্তু জামাইবাবু? জামাইবাবুকে না পেলে তো ক্যামেরাই মিথ্যে!
রাত্রে শুয়ে ডাকে, মা!
পাশের খাট থেকে মা বলেন, কি, কে?
বড় আপু-জামাইবাবু আর আসে না কেন?
টিটোর মুখে জামাইবাবু! মা হেসে বলেন, ব্যাপার কি?
ব্যাপার আবার কি। আত্মীয়লোক, অনেক দিন না দেখলে মন কেমন করে না?
ওরে বাবা, তোর আবার মন কেমন করে! মা আরো হাসেন, তারপর বলেন, আসবে কি, যা দূরে বদলি হয়ে গেছে জামাই। এই সামনের রমজানে আসবে ছুটি নিয়ে।
রমজানে! টিটো হতাশভাবে বলে, সে তো সেই জুন মাসে নাকি
ওমা শোনো কথা! জুন মাস কিরে? এই তো কদিন পরে
দিন পরে! পুলক গোপন করতে পারে না টিটো। কদিন পরে মা? টিটোর কণ্ঠে আগ্রহ ব্যাকুলতা।
তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে, আজ রাতে হলেই ভালো হয়।
এই তো আজ এপ্রিল শেষ হয়ে গেলো, সামনের মাসেই তো কিন্তু টিটোর ওই হিসেব ভালো লাগে না, সে ট করে উঠে পড়ে আলোটা জেলে ফেলে।
কি হলো? উঠলি যে?
আরবী ক্যালেণ্ডার ছিলো না একটা?
কী মুশকিল! ক্ষেপলি নাকি? ওদের নিয়ে কিছু স্বপ্নাদেশ পেলি নাকি, তাও তো বুঝছি না। আরবি ক্যালেন্ডার তো খাবার ঘরের দেয়ালেততোক্ষণে টিটো খাবার ঘরে চলে গেছে।
আশ্চর্য! আশ্চর্য!
কী অলৌকিক সঙ্ঘটন! এক রমজান পড়েছে শুক্রবারে! অর্থাৎ টিটোর ছুটির বারে। সারাটা দিন ধরেই সুযোগ পাবে টিটো। এখন শুধু দিন গোনা, আর একটা ফিল্মের রোল কেনা। তার ন্যে আবার চালাতে হবে আবেদনের যুদ্ধ। তা হোক। যুদ্ধে জয়ী হবেই টিটো!
তারপর? তারপর যুদ্ধে জয়ী হলে টিটো। মা'র কাছ থেকে আদায় করলো পয়সা। কিনে আনলে৷ ফিল্ম। আর জামাইবাবুও এলেন যথা সময়ে।
তারপর ?
বুঝতেই পারছো এতোদিনকার নিরুদ্ধ প্রতিশোধ বাসনা কিভাবে করিৎকর্মা করে তুল টিটোকে। ক্যামেরাটা কাউকে না দেখিয়ে, ফটো তুলছে বুঝাতে না দিয়ে তুলে ফেললো কয়েকখানা ছবি। বেশ মহামুহুর্ত দেখেই তুললো।
এদিকে বাড়িসুদ্ধ সবাই তাকে মূহুর্মুহু প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছে, কইরে, তোর অতো সাধের ক্যামেরা কি হলো? কিনতে না কিনতেই শখ মিটে গেলো? জামাইবাবুদের ছবি তোল একটা!
ছোটকাকা বললেন, ভেঙে-টেঙে ফেললি নাকি ?
আর নতুন কাকা জামাইয়ের আড়ালে বললেন, আসল কথা বুঝছো না, জামাইয়ের অমন দামি ক্যামেরা আছে দেখেছে, তার সামনে সস্তার বক্স ক্যামেরা দেখাতে বাবুর লজ্জা হচ্ছে।
অবশ্য টিটো বলতে পারতো, তুমি নিজেই তো ওটাকে বলেছো টিনের কৌটো। কিন্তু বললো না। বলে কি হবে? বড়োরা তো সব সময়ই পরস্পরবিরোধী কথা বলে, সে কথার উল্লেখ করলে কি লজ্জিত হয়? ল্টো বরং বলবে ডেপো অথবা বলবে উদ্ধত। অতএব টিটো চুপ করে থাকে, আর ছোটকাকা লম্বা এক লেকচার ঝাড়েন। ওই তো ওই জন্যেই আমরা বাংলাদেশীরা উচ্ছন্নে যেতে বসেছি। অবস্থার অতিরিক্ত ফ্যাশন করতে হবে! কেন রে ভাই?  যে যেমন সে তেমন। জামাই মাসে হাজার টাকা রোজগার করে, তুই করিস? আরো অনেক ভালো ভালো কথা বললেন তিনি।
যাক এসবে কিছু এসে যায় না টিটোর। এতোদিনের বাসনা চরিতার্থ হয়েছে তার, এতেই সে খুশি।
এখন শুধু প্রিন্ট করিয়ে আনা!
জামাইবাবু থাকতে থাকতেই করাতে হবে।
হ্যা, তা সে করিয়েও ছিলো।
জামাইবাবু থাকতে থাকতেই প্রিন্ট করিয়ে এনেছিলো ফিল্মটা ।
ফুরোবার জন্যে রাস্তায় এলোমেলো ছবি তুলে, গুছিয়ে নিয়েছিলো কাজ।
চার-চারখানা ছবি সে তুলেছে একখানা হচ্ছে, জামাইবাবু যখন গাল কুঁচকে মাংসের হাড় চিবোচ্ছেন, একখানা তিনি যখন র্বচোষ্য খেয়ে খালি গায়ে পড়ে পড়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছেন দিন-দুপুরে, আর একখানা যখন বাবুসাহেব একগাল সাবানের ফেনা মেখে, আর একগালে ক্ষুর বুলিয়েছেন এবং চরম শেষখানি হচ্ছে যখন রাত্রে ট্রেনে মোটেই ঘুম হয়নি বলে বিরাট মুখ খানি বিশ্রী করে হাই তুলছেন।
এইখানেই মারকাটারি হবে, কারণ ছবিগুলোর এক একটা ক্যাপশন তৈরি করে ফেলেছে সে ইতিমধ্যে। এই ছবিটার ক্যাপশন ঠিক করেছে টিটো সগোষ্ঠির বিশ্বরূপ দর্শন ।
সগোষ্ঠিই সত্যি! ঠিক সেই সময় বাড়িসুদ্ধ প্রায় সকলেই সদ্য আগত জামাইকে ঘিরে বসেছিলেন। হাজার টাকার জামাই। সোজা সমীহ তো নেই সকলের!
কতো কৌশলে আর কতো তা করে যে টিটো আত্মগোপন করে থেকে তুলেছে এটা।
আর আর ছবিগুলোর ক্যাপশন হচ্ছে আহা কী সুন্দর! ঘুম না অজ্ঞান! আর একখানা মানুষ কি একদা হিংস্রন্য প্রাণী ছিলো না আজও আছে?
ক্যাপশন সমেত ছবিগুলি জামাইবাবুকে উপহার দেবে সে। জামাইবাবুর চাইতে বেশিই করবে। ছবির সঙ্গে ক্যাপশন, চাদের ওপর বুড়ো, সোনার ওপর সোহাগা! তারপর ছবির দোকানে গেলো টি টো ।
-হয়েছে ?
-হ্যা এই যে। কিন্তু মানে আপনি বলেছিলেন সবগুলোই প্রিন্ট করতে, তাই
ঠিক আছে, ঠিক আছে। পয়সা মিটিয়ে দিয়ে চটপট বেরিয়ে আসে টিটো দোকান থেকে।
ধীরে-সুস্থে এসে বসে একটা পার্কের বেঞ্চে রাস্তায় তোলা আজে-বাজে ছবিগুলো দেখে নেয় তাড়াতাড়ি।
একটা গাড়ি, একটা ঝাঁকা মুটে, একটা ডাস্টবিন, একটা শালপাতা খেকো গরু--তারপর এসে পড়ে আসল ছবি!
কিন্তু এ কী ?
এসব কি হয়েছে? কেমন করে কি হলো কোন ছবি জামাইবাবুকে উপহার দেবে টিটো? কিসে কি ক্যাপশন বসাবে?
গালে সাবানের ফেনা আহা কি সুন্দর ছবিটার অসৌন্দর্য কোথায়? এ তো জামাইবাবু তোয়ালে দিয়ে গাল মুছছেন! দিব্যি স্বাভাবিক পরিষ্কার ভাব। আর এই ঘুম না অজ্ঞান এই বা কেমন করে দেওয়া যাবে? দিলে আগে তো বড় আপুর হাতে পড়বে! আর ছবি দেখার পর বড় আপুর কি জীবনে আর কখনো ছোটো ভাইকে ক্ষমা করবে? না করাই সম্ভব, আর জামাইবাবুর সেই স্তব্ধ স্থির ঘুমে পাথর দেহের ছবিটির যা ভঙ্গী হয়েছে, তাতে এর ক্যাপশন হওয়া উচিত, নিদ্রা না মহানিদ্রা! নাক ডাকাটা তো ক্যামেরায় ধরা পড়ে না !
টিটো যে টিটো, তারই প্রাণটা কেমন করে উঠলো ছবিটা দেখে। এ ছবি বার করা চলে না। আর মানুষ কি একদা হিংস্রপ্রাণী ছিলো ছবিটাই বা এমন বদলে গেলো কি করে? মাংসের হাড় হাতে করে তার সঙ্গে যেন কথা বলছেন জামাইবাবু। মুখের ভাব স্নিগ্ধ সদা হাস্যময়মোলায়েম।

অন্যান্য গল্প 



















No comments:

Post a Comment

Popular Posts