Total Pageviews

Friday, April 10, 2020

Preface to Shakespeare (Preface to the Plays of William Shakespeare) – Dr. Samuel Johnson – Translation in Bengali

Preface to Shakespeare – Dr. Samuel  Johnson –  Translation in Bengali (Part 1 of 6)


Preface to Shakespeare or Preface to the Plays of William Shakespeare – Dr. Samuel  Johnson –  Translation in Bengali (Part 1 of 6)
পূর্বের মৃত ব্যক্তিকে উদারচিত্তে প্রশংসা অনেকেই করে থাকেন, শুধু প্রাচীনত্বের জন্যেই, বিগতদের সাহিত্য কর্মের জন্য নয় এরকম অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায় তাঁরাই কাজটি বেশি করেন যারা শাশ্বত সত্যের প্রবহমান ধারায় নতুন কিছুর সংযোগ ঘটাতে পারেন না এবং মনে করেন অতীতের বিগত ব্যক্তিদের সাহিত্য কর্ম সম্বন্ধে বিতর্কিত কিছু মন্তব্য করলেই তারা বর্তমান প্রজন্মের কাছে সমাদৃত না হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সমাদৃত হবেন।
অতীত হওয়া ব্যক্তিকে, শুধু অতীতকালের জন্যেই অনেক ভক্ত প্রশংসা করে থাকেন। এটাই মানব জাতির গুণ। তারা যে অতীতকে যথেষ্ট যুক্তি, বুদ্ধি দিয়ে বিচার করেন তা নয়, তারা শুধু সংস্কারবশতই তা করে থাকেন। এদের মধ্যে অনেকেই সময়ের আনুকূল্যে বহুকাল ধরে সংরক্ষিত সাহিত্যকর্মকে নির্বিচারে প্রশংসা করে গ্রহণ করেন। অনেকেই আবার বর্তমানের উৎকৃষ্ট কর্মকে ফেলে অতীতের সাহিত্য কর্মেরই প্রশংসা করে, এমনভাবে অতীত প্রতিভাকে যুগের ছায়ায় দেখে, যেমন করে কৃত্রিম আড়াল থেকে আমরা সূর্যকে দেখি। তাদের সমালোচনা; বর্তমানকে হেয় করে অতীতকে শ্রেয় করেই সন্তুষ্ট। লেখক যখন জীবিত তখন তারা তার নিকৃষ্ট কর্মটি দিয়েই তাকে বিচার করে আর লেখকের মৃত্যুর পর তার উৎকৃষ্ট কাজটি দিয়েই তাঁকে বিচার করে।
কোনো সাহিত্যকর্মের বিচারই চূড়ান্ত বা সর্বোৎকৃষ্ট নয় সাহিত্যকর্মের বিচার হয় কালানুক্রমিক তুলনামূলকভাবে কালের বিচারে যে সাহিত্যকর্ম কালজয়ী হয়, সে সাহিত্যকর্মই অধিক সম্মান অর্জনে সক্ষম। মানব জাতির যুগ যুগ সঞ্চিত সাহিত্য কর্মকে, মানুষ যুগ যুগ ধরে তুলনামূলক বিচার করেই গ্রহণ করেছে এবং তুলনামূলক বিচারে যে সাহিত্য-কর্মটি টিকে গেছে তাকেই মানুষ সযত্নে সংরক্ষণ করেছে। প্রাকৃতিক বস্তুগুলোকেও মানুষ তুলনা করেই গ্রহণ করেছে : একটা নদীর গভীরতার সঙ্গে অন্য আরেকটি নদীর গভীরতাকে তুলনা করেই মানুষ একটা নদীকে বেশি গভীর বলেছে, একটা পাহাড়ের উচ্চতাকে অন্য পাহাড়ের উচ্চতার সঙ্গে তুলনা করেই একটা পাহাড়কে বেশি উঁচু বলেছে। একইভাবে, এক প্রতিভাকে অন্য প্রতিভার সঙ্গে তুলনা না করে, কোন প্রতিভাটি শ্রেয় বা শ্রেয়তম তা বলা যায় না। তুলনামূলক বিচারে সাহিত্যকর্মের উৎকর্ষ বিচার করা যায় তাতে সময়ের অতিক্রমণে ভীত হবার বা আশান্বিত হবার তেমন কিছু নেই। কিন্তু পরীক্ষামূলক বা সম্ভাব্য সাহিত্যকর্মকে সমগ্র মানব জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টা দক্ষতার নিরিখেই গ্রহণ করতে হবে। মানব নির্মিত প্রথম ইমারতটি গোলাকার ছিল না চতুষ্কোণ ছিল তা নিশ্চিত করে বলা গেলেও, ইমারতটিতে যথেষ্ট পরিসর ছিল কিনা, ইমারতটি সুউচ্চ কিনা, তা যুগের প্রেক্ষিতেই বিচার্য। পিথাগোরাসের সংখ্যাক্রম তাৎক্ষণিকভাবেই নির্ভুল বলে গৃহীত হয়; কিন্তু হোমারের কবিতাকে তেমন সুনির্দিষ্ট কিছু আজও বলা যায়নি, শুধু শতাব্দীর পর শতাব্দী, জাতির পর জাতি, হোমারের কাব্য কর্মে বর্ণিত ঘটনায়, চরিত্রে কিঞ্চিৎ পরিবর্তন এনেছে মাত্র বা হোমারের মূল ভাবকে অপরিবর্তিত রেখেছে। বিজ্ঞানের বিষয়কে যত সহজে চূড়ান্ত ধরা যায় সাহিত্যের বিষয়কে তত সহজে চূড়ান্ত বলা যায় না।
অতএব, দীর্ঘকাল ধরে সাহিত্য ভাণ্ডারে যে সব কর্ম জমা হয়েছে, সেই অতীত সঞ্চয়কে অতিবিশ্বাসে যেমন শ্রেয় বলা যায় না তেমনি তাকে মানব চিন্তার অবক্ষয়েয় ইতিহাস বলেও চিহ্নিত করা যায় না। বরং বলা যায়, কালের পরীক্ষায় যা সন্দেহাতীতভাবে উত্তীর্ণ, যার সঙ্গে মানুষের দীর্ঘকাল ধরে পরিচয় তাকেই বিবেচনায় নেয়া যায় এবং যাকে অধিক বিবেচনায় নেয়া যায় তাকেই সবচেয়ে বেশি বুঝা যায়
যে কবির কর্মকে আমি পর্যালোচনা করব বলে স্থির করেছি, তিনি নিশ্চয়ই প্রাচীনত্বের দাবি করতে পারেন, প্রাচীনত্বের সব সম্মান দাবি করতে পারেন। তিনি তার শতাব্দীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, তাঁর সাহিত্যকর্মের গুণেই। স্থানীয় সংস্কৃতি, জনমত থেকে তিনি যেটুকু সুবিধা পেয়েছিলেন তা বহু আগেই অপসৃত; যুগের অস্থায়ী আনন্দ, বেদনার যে সব উপাদান তার সৃজনশক্তিকে আলোকিত করত তাও এখন অবলুপ্ত। তার সমর্থক বা প্রতিযোগীরাও এখন আর নেই। নেই তার বন্ধুরা বা তাকে ঈর্ষাকারীরা। এখন আর তাকে প্রশংসা বা নিন্দা করার মতো কোনো সমকক্ষ নেই, তবু তার রচনা মানুষ আজও আনন্দ অভিপ্রায়ে পাঠ করে, আনন্দ পায় বলেই আজও মানুষ তা পাঠ করে। সমাজের আচরণগত, প্রথাগত পরিবর্তন, বিবর্তন সত্ত্বেও তার রচনা আজও মানুষ আনন্দ লাভের আশায় পাঠ করে থাকে। সময়ের প্রতিটি পরিবর্তনে তাঁর কর্ম নতুন করে আরো সম্মান অর্জন করেছে।
মানব-বিচার যদিও যৌক্তিকভাবেই এগিয়ে চলে, তবুও তা সব সময় নির্ভুল হয় না  দীর্ঘস্থায়ী প্রশংসাও তাই হতে পারে একটা সংস্কারের দীর্ঘসূত্রিতা। তাহলে, শেক্সপিয়রের দীর্ঘ জনপ্রিয়তাকে, তাঁর রচনার উৎকৃষ্টতাকেও পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে, যে রচনা দীর্ঘকাল তার দেশবাসীর নিরঙ্কুশ আনুকূল্য পেয়ে এসেছে।
কোনো কিছুই বহু মানুষকে বহুদিন সন্তুষ্ট রাখতে পারে না। প্রকৃতির বিশুদ্ধ রূপায়নই কেবল স্থায়ী আবেদন রাখতে পারে। খুব কম মানুষই ব্যাপারটা বুঝে, তাই খুব কম মানুষই বুঝতে পারে প্রকৃতিকে কতটা নিখুঁতভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। কল্পনার রং ক্ষণিকের আনন্দ যোগাতে পারে, ক্ষণিকের তুষ্টির কারণ হতে পারে, কিন্তু এরকম সন্তুষ্টির স্থায়িত্ব খুব কম। চির সত্যের স্থায়িত্বই বেশি।
আধুনিক সব লেখকদের তুলনায় শেক্সপিয়রই হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি প্রকৃতিবাদী, সবচেয়ে বড়ো প্রকৃতির কবি, জীবনের সবচেয়ে বড়ো রূপকার। তাঁর চরিত্ররা কোনো নির্দিষ্ট স্থানের নয়, তারা চিরকালীন মানুষ। পেশায়, পোশাকে, মনোভাবে ভিন্ন হলেও তারা আবহমান কালের মানুষেরই প্রতিভূ। মানসগঠনে, জীবনাচরণে তারা মানুষই। অন্য লেখকদের চরিত্ররা শুধু একজন ব্যক্তিই, শেক্সপিয়রের চরিত্ররা সমগ্র মানব জাতিরই প্রতীক। শেক্সপিয়রের চিত্রিত বহু চরিত্রের মাঝেই দেখা যায় তারা বাস্তববাদী, সংসারজ্ঞানী। শোনা যায়, ইউরিপিডিসের [Euripides (খৃ: পূ: ৪৮০-৪০৬) অব্দে গ্রিক নাট্যকার ছিলেন] প্রতিটি শ্লোকই ছিল নৈতিক শিক্ষাপূর্ণ একইভাবে শেক্সপিয়র সম্পর্কে বলা যায়; তার কর্ম ছিল সাংসারিক অর্থনৈতিক প্রজ্ঞায় পূর্ণ। তাঁর প্রকৃত প্রতিভা দুএকটি উদ্ধৃতির ঔজ্জ্বল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তার গল্পাংশের ক্রমবিকাশ, চরিত্রদের উচ্চারিত সংলাপের মধ্যেই তাঁর মৌলিকতার সন্ধান পাওয়া যায় কেউ যদি শেক্সপিয়রকে তাঁর বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে বিচার করার কথা বলে, তাহলে ফল হবে হাইয়ারোক্লীসের (Hierocles৫ম খ্রিস্টাব্দের গ্রিক দার্শনিক) পাণ্ডিত্যের মতো হাইয়ারোক্লীস একদা তাঁর বাড়িটি বিক্রি করতে মনস্থ করলে, তিনি ক্রেতার কাছে তাঁর বাড়িটির নমুনা দেখাবার জন্য পকেটে করে একখানা ইট নিয়ে যান।
অন্য লেখকের সঙ্গে তুলনা না করে, শেক্সপিয়র যে কত জীবননিষ্ঠ ছিলেন তা বুঝানো যাবে না। প্রাচীনকালে বিদ্যালয়গুলোতে, যত বেশি পরিশ্রম করে বিদ্যার্থীদের শিক্ষিত করা হতো, দেখা যেত বিদ্যার্থীরা তত বেশি বাস্তবজ্ঞানী হয়ে উঠত না। কারণ বিদ্যালয়ের বাইরে বিদ্যার্থী তার অর্জিত জ্ঞানের সাক্ষাৎ পেত না। শেক্সপিয়র ব্যতিত অন্য লেখকদের রচনা সে রকমই ছিল। অন্য নাট্যকারদের নাটকে সব অচেনা চরিত্রের দেখা পাওয়া যেত, তাদের চরিত্র, সংলাপ সবই ছিল অচেনা, জীবনের প্রাত্যহিকতা বিবর্জিত। কিন্তু শেক্সপিয়রের নাটকের সংলাপগুলো অতি চেনা ঘটনা থেকেই উঠে আসত বলেই সেগুলোকে অতিচেনা মনে হয়, অতি সরল মনে হয় মনে হয়, সেগুলো যেন সাধারণ ঘটনা, সাধারণ কথোপকথনেরই কঠিন শ্রমে মার্জিত প্রতিরূপ। সব নাটকেরই কেন্দ্রীয় বিষয় হচ্ছে, প্রেম; সব ভালোমন্দই প্রেম কেন্দ্রিক, প্রেমকে কেন্দ্র করেই নাটকের সব কর্ম এগিয়ে যায় বা পিছিয়ে আসে। গল্পে একজন প্রেমিকা আর তার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী আসে, তারা পারস্পরিক বৈপরিতে জড়িয়ে পড়ে : স্বার্থের দ্বন্দ্বে বিচলিত হয়, ঘাত প্রতিঘাতে লিপ্ত হয়, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয় বা বিষাদাক্রান্ত হয়, প্রেমের এই সব বৃত্তেই আধুনিক নাট্যকাররা ঘুরে বেড়ায় ফলে জীবনে যা সম্ভব [(এরিস্টোটলের সম্ভাব্যতা স্মর্তব্য - এরিস্টোটল তাঁরপয়েটিকসেমন্ত্যব্য করেন; যা সম্ভাব্য তাই বিশ্বাস্য)] তা হারিয়ে যায়, জীবনের অবিকল চিত্র ফুটে উঠে না, সংলাপও হয় নিম্নমানের। কিন্তু মানুষের অনেক আবেগের মধ্যে প্রেম-কেন্দ্রিক আবেগ একটি এবং মানুষের সমগ্র জীবনের উপর প্রেমের প্রভাব যেহেতু গৌণ, সেহেতু যে নাট্যকারের নাটকের উপকরণ জীবন থেকে নেয়া, সে নাট্যকারের নাটকে প্রেমের বিষয় গৌণই থাকে। কারণ, তিনি জানতেন, স্বাভাবিক বা আস্বাভাবিক যে কোনো আবেগের আতিশয্যই জীবনে অতি আনন্দ বা বিপর্যয় দুটোই ডেকে আনতে পারে।
শেক্সপিয়রের বহু চরিত্রদের মধ্যে কোনো বিশেষ বা নির্বিশেষ নেই, তথাপিও শেক্সপিয়রের মতো কোনো নাট্যকারই তার চরিত্রদের মধ্যে পার্থক্য রাখতে পারেননি। কবি আলেকজান্ডার পোপের মতো আমি বলব না; শেক্সপিয়রের চরিত্রদের একটির সংলাপ সহজেই অন্যটির মুখে জুড়ে দেয়া যায় কারণ চরিত্রদের তেমন কোনো বিশিষ্টতা নেই। আপাত দৃশ্যে শেক্সপিয়রের চরিত্রদের এক রকম মনে হলেও, একের সংলাপ অন্যের মুখে জুড়ে দেয়া সম্ভব নয় কখনো কখনো সম্ভব হলেও সব সময় নয় তা অন্য নাট্যকারদের চরিত্রের সংলাপগুলো হয় উচ্ছ্বসিত, অতিরঞ্জিত না হয় নিম্নমানের। তাদের গল্পগুলোও অতিরঞ্জিত, অশ্রুতপূর্ব, ঠিক রোমান্স রচনাগুলোর মতো রোমান্স-রচনাগুলোর বামন আর দৈত্যদের কাহিনি থেকে কেউ যদি মানবীয় দীক্ষা পেতে চায়, তাহলে সে নিশ্চিত হতাশ হবে। শেক্সপিয়রের নাটকে রোমান্স কাহিনির মতো তেমন কোনো বীরের দেখা পাওয়া যায় না, তার চরিত্ররা সব মানুষ, সব নাটকের দৃশ্যগুলো মানুষে পরিপূর্ণ, তারা এমন ভাষায় কথা বলে, যে কোনো দর্শক যেন চরিত্রের অবস্থানে থাকলে একই রকম ভাষায় কথা বলত। এমনকি চরিত্রগুলো যদি অতিপ্রাকৃত পরিবেশে স্থাপিত হয় তবুও সংলাপগুলো থাকে জীবনমুখী। অন্য নাট্যকাররা স্বাভাবিক আবেগ ঘটনাকে এমনভাবে আড়াল করে উপস্থাপন করে যা কখনো জীবনানুগ হয় না, বাস্তবসদৃশ হয় না। শেক্সপিয়র দূরবর্তীকে কাছে আনেন জীবননিষ্ঠ করেন, বিস্ময়করকে সুপরিচিত করেন, সহজ করেন। যে সব ঘটনা শেক্সপিয়র বর্ণনা করেন তা হয়ত অবিকল ঘটে না কিন্তু ঘটলে যেমন করে শেক্সপিয়র তাদের বর্ণনা করেন ঠিক তেমনভাবেই ঘটত। মানব চরিত্রকে, তিনি জীবনে যেমন দেখেন তেমন করেই নেন না শুধু, অপ্রত্যাশিত কোনো পরিস্থিতিতে কী ঘটতে পারত, সে পরিস্থিতিতেও দেখান।
অতএব, শেক্সপিয়রের অনন্যতা হচ্ছে তার নাটক হচ্ছে জীবনের দর্পণ। অন্য নাট্যকারদের নাটকে থাকে অদ্ভুত সব কল্পনার জঞ্জাল-জটা, দর্শককে যে সব কল্পনা বিভ্রান্ত করে। শেক্সপিয়রের নাটক পাঠে দর্শক সে জঞ্জাল-জটার বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হতে পারে, জীবন-শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে। একজন পাপী আর একজন সন্ন্যাসী শেক্সপিয়রের নাটক থেকে সমানভাবে জ্ঞান সমৃদ্ধ হতে পারে। কিন্তু তাঁর প্রকৃতিনিষ্ঠতা জীবন ঘনিষ্ঠতাকে অনেক সমালোচকই সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিতে দেখেছেন। ডেনিস (জন ডেনিস (১৬৫৭-১৭৩৪) শেক্সপিয়র সমালোচক) রাইমার (Dennis and Rhymer) মনে করেন, শেক্সপিয়র চিত্রিত রোমান চরিত্রগুলো যথেষ্ট রোমানরূপে উপস্থাপিত নয় আর ভল্টেয়ার (Voltaire) মনে করেন, শেক্সপিয়র রাজার চরিত্রকে ঠিক রাজসিকভাবে উপস্থাপন করেন না। রোমের সিনেট সদস্য ম্যানেনুইসকে (Menenius শেক্সপিয়রের নাটককোরিওলেনাসএর একটি রোমান চরিত্র) একটা ভাড় (buffoon) হিসেবে শেক্সপিয়র উপস্থাপন করেন, এতে ডেনিস ক্ষুব্ধ হন, আর রোম থেকে আগত ম্যানেনুইসকে মাতাল দেখানো হয় এতে ভল্টেয়ার ক্ষুন্ন হন। কিন্তু শেক্সপিয়র সব সময়ই প্রাকৃতিকতাকে প্রাধান্য দেন, কোনো হঠকারিতাকে নয় চরিত্রদের কোনো আতিশয্য দিয়ে সাজান না। তিনি চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য বজায় রাখেন, অতিরঞ্জিত কোনো কিছু চরিত্র আরোপ করেন না। নাটকের প্রয়োজনে শেক্সপিয়র, রোমান চরিত্র রাজার চরিত্র আনেন কিন্তু সর্বত্র তিনি মানুষকে, মানব-রূপকে মনে রেখেই চরিত্র চিত্রণ করেন। তিনি জানতেন, পৃথিবীর সব দেশেই সব ধরনের মানুষ থাকতে পারে, রোমের সিনেট সদস্যদের মধ্যেও মাতাল থাকতে পারে, ভঁড় থাকতে পারে। শেক্সপিয়র একজন খুনিকে শুধু খারাপ মনে করতেন না, ঘৃণ্যও মনে করতেন। তাই তাকে মাতাল দেখান। শেক্সপিয়র জানতেন রাজারা মদ্যপ হন, অন্য অনেক মানুষের মতোই, তাই তিনি রাজাদেরকেও মদ্যপরূপে দেখান। শেক্সপিয়রের চরিত্রসমূহে এরকমই ছোটো খুঁত খুঁজে বেড়ান, ছোটো মনের সমালোচকরা। কবি, নাট্যকাররা দেশে দেশে মানুষের আচরণিক ব্যবধানে নির্লিপ্ত থাকেন, যথার্থ শিল্পী যেমন মূল শিল্প কর্মেই মনোনিবেশ করেন, চিত্রিত মানুষটির বহিরাবরণে নয় - শেক্সপিয়র তার সব নাটকে ট্র্যাজেডি কমেডিকে মিশিয়ে ফেলেন- সমালোচনাটি বেশ বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথমে বিষয়টি বর্ণনা করা যাক, পরে তার পর্যালোচনা করা যাবে।
শেক্সপিয়রের নাটকগুলো কঠিন সমালোচনা বিচারে সঠিকভাবে ট্র্যাজেডি নয় কমেডিও নয়, এরা এক ভিন্ন ধরনের রচনা, বাস্তব জীবনের রূপকার, ভালো মন্দের সমন্বয়ে, দুঃখ আনন্দে গড়া, অফুরান বৈচিত্র্যে ভরা যে জীবন তারই প্রতিরূপ। যে পৃথিবীতে একের ক্ষতি অন্যের লাভের কারণ, যে পৃথিবীতে একই সময়ে কোনো মদ্যপ মদের সন্ধানে ছোটে আর কোনো বেদনাক্লিষ্ট মানুষ বন্ধুকে সমাধিস্থ করতে যায়, যে পৃথিবীতে একই সাথে বহু পাপ আর পুণ্যের ঘটনা ঘটে, শেক্সপিয়রের নাটক তারই প্রতিরূপ।
বাস্তব জীবনে পারস্পরিক বিরোধের এই সংমিশ্রণকে প্রাচীন কবিরা তাদের যুগে প্রচলিত প্রথানুযায়ী মানুষের জীবনকে খণ্ডিতভাবে চিহ্নিত করেছেন : মানুষের অপরাধ প্রবণতা এবং অসম্ভবতা, ভাগ্যের পরিবর্তন, লঘু ঘটনাবলি, ভীষণ বিষাদ এবং ঐশ্বর্যের আনন্দ, সবকে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখেছেন। খণ্ডিতরূপে দেখেছেন। ফলে জীবনের অনুকরণ হয়েছে দুভাবে-একটার নাম হয়েছে ট্র্যাজেডি, অন্যটির নাম হয়েছে কমেডি। তারা কখনো দুটোর মিশ্রণ ঘটাননি, এমন কোনো গ্রিক বা রোমান নাট্যকারের নাম আমার স্মরণে আসে না যিনি দুটোকে মিশ্রিত করেছেন। শেক্সপিয়র একই নাটকের একই চরিত্রের মধ্যে দুঃখ আনন্দের মেল বন্ধন ঘটিয়েছেন। তার প্রায় সব নাটকেই চরিত্ররা গম্ভীর হাস্যকর দুভাগে বিভক্ত এবং নাটকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চরিত্ররা কখনো গম্ভীর, বেদনার্ত, কখনো লঘু, পরিহাস প্রিয় হয়ে ফুটে উঠে।
এমন চর্চা অবশ্যই সমালোচনা-শাস্ত্র বিরোধী কিন্তু সমালোচনা শাস্ত্রের তুলনায় জীবন নিষ্ঠতার আবেদন বেশি। যে কোনো রচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে উপদেশ দান, কবিতা বা নাটকের উদ্দেশ্য হচ্ছে আনন্দের মাধ্যমে উপদেশ দান। ট্র্যাজেডি, কমেডি মিশ্রিত নাটক যে ট্র্যাজেডি কমেডি উভয়ের উপদেশই একই সাথে ধরে রাখে তাও অস্বীকার করা যায় না, কারণ, পালাক্রমে হাসি, কান্না উভয়ের প্রদর্শন মিশ্র-নাটকে হয়ে থাকে, জীবননিষ্ঠভাবে। জীবনে যেমন হাসি কান্নার অপরিহার্যতা থাকে, প্রলম্বন থাকে পালাক্রমে।
সমালোচকরা যুক্তি দেখান; বিষাদের পর হর্ষ (আনন্দ)-দৃশ্য অবতারণা, আবেগ প্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং যথোপযুক্ত ঘটনা বিশ্লেষণ দিয়ে, প্রস্তুতিমূলক ঘটনা দিয়ে আবেগকে ঘনীভূত করা যায় না, ফলে নাটকটি সম্পূর্ণ বিকশিত হয় না। সমালোচকদের এই যুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে এতই গ্রাহ্য যে, প্রাত্যহিক জীবনে এটিকে মিথ্যা জেনেও অনেকেই যুক্তিটি গ্রহণ করেন। হাসির দৃশ্যের পর দুঃখের দৃশ্য কার্যত আবেগের প্রকাশ বিকাশকে কদাচিৎ বিঘ্নিত করে। তাছাড়া, নাটকে গতি আনবার জন্য মনোযোগ বিকেন্দ্রায়ন প্রয়োজন, সে কারণেই চরিত্রের একাকীত্বের মাঝে হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত লঘুতার অনুপ্রবেশকে অনুমোদন দেয়া আপত্তিজনক হওয়া অনুচিত। আর একাকীত্ব খুব সুখকর কিছু নয় বরং লঘু দৃশ্য দিয়ে একাকীত্বের ভারকে লাঘব করা যায় আর একেকজন দর্শক একেকরকম দৃশ্য পছন্দ করে, সর্বোপরি বৈচিত্র্যেই আনন্দ থাকে সবচেয়ে বেশি। যে সব সম্পাদক তাঁদের সম্পাদনায় শেক্সপিয়রের নাটককে ট্র্যাজেডি, কমেডি ঐতিহাসিক নাটক এই তিন পর্যায়ে বিভক্ত করেন, তারা খুব সঠিক ধারণা নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে এই বিভাজনটি করেছেন বলে মনে হয় না।
সে তাঁদের মতে, নাটকের মধ্যে যত দুঃখই থাকুক না কেন নাটকটি যদি আনন্দ নিয়ে শেষ হয়, তাকেই তারা কমেডি বলেছেন। কমেডির ধারণাটি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ফলে শুধুমাত্র বিপর্যয়ের দৃশ্যটি (Catastrophe) বদলে, যে নাটকটি আজ ট্র্যাজেডি, সেটিই কাল কমেডি হয়ে যেত।
সে যুগে ট্র্যাজেডিকে কমেডির চেয়ে উচ্চমর্যাদা দেয়া হতো না। শুধুমাত্র বিপর্যয়ের দৃশ্য দিয়ে শেষ হলেই তাকে ট্র্যাজেডি বলা হতো, নাটকটির মধ্যে অনেক লঘু দৃশ্য থাকলেও সে যুগের সমালোচকরা নাটকটিকে ট্র্যাজেডি আখ্যায়িত করেই সন্তুষ্ট থাকতেন।
ইতিহাস হচ্ছে কতকগুলো বিগত ঘটনার, স্বাধীন ধারাবাহিক বর্ণনা। ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর একটি অপরটির সমাপ্তিকে প্রভাবিত করে না। ট্র্যাজেডির সঙ্গে এর ব্যবধানও খুব সুচিন্তিতভাবে ব্যাখ্যা করাও হয়নি।রিচার্ড দি সেকেন্ডনাটকটির চেয়েএন্টোনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রানাটকটিতে ‘Unity of action’ এর নীতি খুব বেশি অনুসৃত হয়নি। ইতিহাসকে বহু নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়, কারণ এতে কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় না এবং এর কোনো সীমাও নেই।
                                             Next Part Link

No comments:

Post a Comment

Blog Archive