Total Pageviews

Friday, April 10, 2020

Preface to Shakespeare or Preface to the Plays of William Shakespeare – Dr. Samuel Johnson – Translation in Bengali (Part 2 of 6)


Preface to Shakespeare or Preface to the Plays of William Shakespeare – Dr. Samuel  Johnson –  Translation in Bengali (Part 2 of 6)
নাটকের নামকরণের এই বিভাজন (ট্র্যাজেডি, কমেডি, ঐতিহাসিক নাটক) সত্ত্বেও শেক্সপিয়রের রচনারীতি ছিল একই রকম: পালাক্রমে হর্ষ বিষাদের অবতারণা; দর্শক মনকে কোমল করার এবং উৎফুল্ল করার নিরন্তর প্রয়াস। কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য যাই থাক: দর্শককে হাসানো বা কাঁদানো বা শুধু গল্পটিকে পরিচিত সংলাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কোনো ক্রোধ বা আবেগের প্রাবল্য ছাড়াসব ক্ষেত্রে তাঁর রচনারীতি একই উদ্দেশ্যে চালিত। তিনি যেমন চান তেমন করেই আমরা হাসি বা কাঁদি বা আশায় নীরব হয়ে বসে থাকি কিন্তু কখনো উদাসীন হয়ে উঠি না।
যদি শেক্সপিয়রের কর্ম-পরিকল্পনাকে একবার সঠিক বুঝা যায় তাহলে রাইমার ভল্টেয়ারের (ভল্টেয়ার (১৬৯৪-১৭৭৮), ফরাসি লেখক, শেক্সপিয়র সমালোচক) সমালোচনা মূল্যহীন হয়ে পড়ে।হ্যামলেটনাটকটি শুরু হয় পাহারাদারদের সংলাপ দিয়ে, ব্রাবনশিওর (Brabantio) জানালায় ইয়াগোর (Iago) চিৎকার (bellows) দিয়েওথেলোনাটকটি শুরু হয়, তাতে নাটকগুলোর অঙ্গহানি ঘটে না যদিও ইয়াগোর অশালীন ভাষা আধুনিক দর্শকের কাছে শ্রুতিকটু লাগে।হ্যামলেটনাটকে পোলোনিয়াস (Polonius) চরিত্রটি বাহুল্য নয়, এমনকি গোরখুঁড়েদের (Grave-diggers) রসিকতাও দর্শক সানন্দে গ্রহণ করে।
শেক্সপিয়র সমগ্র পৃথিবীকে তার সামনে উন্মুক্ত রেখেই তাঁর নাট্য রচনায় ব্রতী হন। সে যুগে প্রাচীন সাহিত্য তাত্ত্বিকদের তত্ত্বও খুব কম জনেরই জানা ছিল, সাহিত্যতত্ত্ব সম্বন্ধে জনগণের ধারণাও সুসংগঠিত ছিল না। শেক্সপিয়রের সামনে অনুকরণ যোগ্য কোনো দৃষ্টান্তও ছিল না বা তার ত্রুটি ধরিয়ে দেবার যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো সমালোচকও ছিল না। তাই তাঁর রচনায় তিনি স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে গেছেন; রাইমারের (টমাস রাইমার (১৬৪১-১৭১৩), শেক্সপিয়র সমালোচক) মতে শেক্সপিয়রের স্বাভাবিক গতি ছিল কমেডির দিকে। তার ট্র্যাজেডিগুলো শেক্সপিয়র অনেক চেষ্টায় অনেক পরিশ্রমে গড়ে তোলেন, তাও খুব উপভোগ্য হয় না। তার কমিক দৃশ্যগুলো তিনি কোনো পরিশ্রম ছাড়া স্বচ্ছন্দেই গড়ে তোলেন, কোনো শ্রম দিয়েই এমন স্বচ্ছন্দ কমিক দৃশ্য গড়ে তোলা যায় না। তার ট্র্যাজিক দৃশ্যগুলো দেখে মনে হয় তিনি যেন বহু কষ্টে সেগুলোকে কমিক হওয়া থেকে রক্ষা করছেন। কমিক দৃশ্য নির্মাণেই তিনি অনেক বেশি স্থির, অনেক বেশি স্বাভাবিক। তার ট্র্যাজিক দৃশ্যে যেন কিছুর অভাব থাকে কিন্তু তাঁর কমিক দৃশ্যগুলো আশাতীতভাবেই সফল। চিন্তায় সংলাপে তার কমিক দৃশ্যগুলো মনোহর। আর তার ট্র্যাজিক দৃশ্যগুলো ঘটনাবহুল, কর্মপূর্ণ। তার ট্র্যাজেডি শ্রমের ফসল, কমেডি সহজাত।
কালের বহু পরিবর্তন সত্ত্বেও শেক্সপিয়রের কমিক দৃশ্যগুলোর আবেদন গত দেড়শবছর ধরে অক্ষুন্নই রয়ে গেছে, সেগুলোর অকৃত্রিমতা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। চরিত্রদের আবেগের অকৃত্রিম প্রকাশের জন্যই তারা সব স্থানে, সব কালে সমানভাবে গ্রহণীয় স্বাভাবিক বলেই তারা সর্বজন, সর্বকাল গ্রাহ্য। ব্যক্তির ব্যক্তিগত আচরণের চমকের স্থায়িত্ব ক্ষণিকের কিন্তু বিশুদ্ধ আবেগের স্থায়িত্ব সুদীর্ঘ। ঘটনাক্রমে বিভিন্ন ভাবের মিশ্রণ ঘটনাচক্রেই আবার বদলে যায় কিন্তু মৌলিক সরলতা কখনো বাড়েও না না কমেও না। জলের এক প্রবাহ বালি তূপীকৃত করে আরেক প্রবাহে বালিগুলো ধুয়ে যায় কিন্তু যেমন করে পাথরগুলো থেকে যায় অনঢ়, তেমনি করে কালের প্রবাহে অন্য কবিদের কীর্তি সব মুছে যায়, অনঢ় থেকে যায় শুধু শেক্সপিয়র।
আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক ভাষারই এমন কিছু প্রকাশ ভঙ্গি থাকে যা কখনো পুরোনো হয় না। এসব প্রকাশভঙ্গি, সাধারণ মানুষের কথোপকথনে অপরিবর্তীত থেকে যায়, প্রতিদিনের ভাব বিনিময়ে ব্যবহৃত হয় এরকম ভাষায় কোনো অলঙ্কার থাকে না। আবার সুরুচিসম্পন্ন মানুষ তার ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবেই পরিমার্জিত করে ব্যবহার করে, অশোভন ভাষা পরিহার করে। কিন্তু দুয়ের মধ্যে এমন একটা ভাষা আছে যা ঠিক অশোভনও নয় আবার খুব পরিমার্জিতও নয় সে ভাষা ভারসাম্যপূর্ণ। শেক্সপিয়র তার কমিক নাটকের সংলাপে সে ভাষারই ব্যবহার করেন। অন্য নাট্যকারদের ব্যবহৃত ভাষার তুলনায় শেক্সপিয়রের ভাষা অনেক বেশি শ্রুতিমধুর। শেক্সপিয়র আমাদের ভাষায় দক্ষ রূপকারও বটে
কিন্তু ব্যতিক্রম বাদ দিলে শেক্সপিয়রের বহুল পরিচিত সংলাপগুলোকে প্রায়ই প্রাঞ্জল মসৃণ হতে দেখা যায় যদিও সব সময় তা কর্কশতা, দুর্বোধ্যতা মুক্ত নয় তার চরিত্রগুলো প্রায়ই স্বাভাবিক হয়ে থাকে। কখনো কখনো তাদের মধ্যে আরোপিত আবেগও অসম্ভব অ্যাকশন দুর্লক্ষ্য নয় শেক্সপিয়রের নাটকে যেমন উৎকৃষ্টতা আছে, তেমনি আছে উৎকৃষ্টাকে নিষ্প্রভ করে দেয় এমন সব ক্রটিও। আমি এখন সে সব ত্রুটিগুলোকে অতিভক্তি বা অতি ঈর্ষায় না দেখে সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করব। প্রয়াত কোনো কবির গুণ বা দোষগুলোর নির্মোহ পর্যালোচনা সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে করা কঠিন অবশ্য।
তার প্রথম ত্রুটি হচ্ছে, তিনি তাঁর রচনার সুবিধার্থে নৈতিকতাকে জলাঞ্জলি দেন, তাঁর প্রধান উদ্দেশ্যই থাকে দর্শককে আনন্দ দেয়া, উপদেশ দেয়া নয় তাই তাঁর রচনার কোনো নৈতিক অভিষ্ট থাকে না। তাঁর রচনায় সত্যটি অনুপস্থিত : কোনো লেখকের সামাজিক দায়িত্ব হচ্ছে; লেখককে যৌক্তিকভাবে ভাবতে গেলেই নৈতিকভাবে ভাবতে হবে। কিন্তু শেক্সপিয়রের গল্পগুলোতে, চরিত্রদের স্বতঃসিদ্ধ সংলাপগুলোতে এই সত্যটি অনুপস্থিত। তিনি ন্যায় অন্যায়ের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য দেখান না। ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট সতর্কও নন। তিনি ন্যায় অন্যায়ের ব্যবধানে উদাসীন থেকে তাঁর চরিত্রগুলোকে ন্যায় অন্যায়ের মধ্য দিয়েই এগিয়ে নিয়ে যান এবং সবশেষে চরিত্রদের ছেড়ে দেন ঘটনাচক্রের হাতে। তাঁর যুগের প্রেক্ষিত বিবেচনা করেও তার ত্রুটিটিকে অব্যাহতি দেয়া যায় না, কারণ কোনো লেখকের দায়িত্বই হচ্ছে পৃথিবীকে পুণ্যের পথ নির্দেশ করা। ন্যায়পরায়ণতা যুগ নির্বিশেষে ন্যায়ই থাকে।
শেক্সপিয়রের গল্পগুলোর গাঁথুনি অত্যন্ত শিথিল অথচ সামান্য যত্নবান হলেই তিনি তার গল্পগুলোর গাঁথুনিকে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে তার শিথিল পরিকল্পনানুযায়ী গল্পগুলো গড়েছেন। তার গল্পগুলোর মাধ্যমে একই সঙ্গে আনন্দ দান উপদেশ দানের সুযোগটি এড়িয়ে গেছেন, তারচেয়ে বরং সে গল্পগুলোই নির্বাচন করেছেন যে গল্পগুলোকে উন্নত করতে কম শ্রম কম চেষ্টা লাগে। তাঁর অনেক গল্প পড়েই বুঝা যায়, তিনি অপেক্ষাকৃত সহজ গল্পই নির্বাচন করেছেন। অনেক গল্পেই দেখা যায়, তিনি তার গল্পের শেষাংশকে অবহেলা করেছেন। গল্পের শেষাংশে পৌঁছে তিনি বেশি পরিশ্রম না করে গল্পটিকে দ্রুত শেষ করতে চেয়েছেন, গল্পটিকে সংক্ষিপ্ত করেছেন। গল্পের যে অংশে তার আরও বেশি শ্রম দেয়া উচিত ছিল সেখানে তিনি তা দেননি। ফলে তার বিপর্যয়ের দৃশ্যগুলো অপূর্ণাঙ্গ অসম্ভাব্য থেকে যায়
তিনি স্থান কালকে পৃথক করে দেখেননি। এক দেশের সংস্কৃতিকে তিনি সম্ভব কল্পনা করে অন্য দেশে স্থাপিত করেছেন। কবি আলেকজান্ডার পোপ মনে করেন, এসব কাজ শেক্সপিয়রের নিজের নয়, পরবর্তীকালে যারা শেক্সপিয়রের রচনা সম্পাদন করেছেন তারাই এই অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো করেছেন। শেক্সপিয়র হেক্টরের উক্তিতে এ্যারিস্টটলের উক্তি জুড়ে দিয়েছেন (Hector quoting Aristotle - ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রিসেইডানাটকে) (এরিস্টোটলের জন্ম হেক্টরের উপাখ্যান রচনার বহু পরে) এবং হিপ্পোলিটা থিসিয়াসের (Theseus and Hippolyta) প্রেম দৃশ্যে গথিক পুরাণের পরীদের [(Gothic mythology of fairies - গথিক পুরাণ :অ্যাজ হউ লাইক ইটনাটকে আবেরণ, টাইটানিয়া, পাক-এসব পরিদের কি দেখানোএসবই পরবর্তী যুগের গথিক মিথের অন্তর্ভুক্ত বিষয়)] জুড়ে দেন। তাঁর যুগে শুধু শেক্সপিয়রই যুগ-ক্রম (chronology) মেনে চলেননি তা নয়, শিক্ষিত মানুষ হয়েও সিডনী (Sidney) তার গ্রামীণ রোমান্স আর্কেডিয়া (Arcadia) তেও যুগ-ক্রম মেনে চলেননি।
তার ক্রমিক দৃশ্যগুলোতেও তিনি খুব সফল নন; বিশেষত, যখন তিনি কমিক চরিত্রগুলোর চটপটে ভঙ্গি আর রসিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ হন। চরিত্রগুলোর রসিকতা অত্যন্ত স্থূল, তাদের আনন্দ-চেষ্টা হয়ে যায় অশালীন এমনকি তার ভদ্র চরিত্ররাও ভাড় চরিত্রগুলো থেকে ভিন্ন হয় না, চেহারা বা আচরণে। তিনি কি তার যুগের প্রচলিত কথোপকথনের ভাষা ব্যবহার করেছেন কি না তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ রানি এলিযাবেথের যুগ ছিল শালীনতা, পরিশোধন আনুষ্ঠানিক আচারের যুগ, সে যুগের প্রেক্ষিতেও তার কমিক চরিত্রদের সংলাপ গ্রহণযোগ্য নয় তাছাড়া, অনেক দর্শকেরই অনেক ধরনের আনন্দ প্রকাশ ভালো লাগতে পারে, লেখকের উচিত সবচেয়ে শালীন ভঙ্গিটিই নির্বাচন করা। ট্র্যাজিক নাটকে তিনি যত বেশি শ্রম দেন ততই যেন সেগুলোর মান নিম্নগামী হয় ট্র্যাজিক নাটকে তিনি দৃশ্যের প্রয়োজনে যে আবেগের প্রকাশ ঘটান তা যথোপযুক্ত কিন্তু তিনি ট্র্যাজিক দৃশ্যকে যত বেশি পরিশীলিত করতে চান ততই দৃশ্যগুলো ক্লান্তিকর দুর্বোধ্য হয়ে উঠে।
বর্ণনা ভঙ্গি শব্দ চয়নে তিনি ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ। তিনি অকারণেই আড়ম্বরপূর্ণ শব্দে দৃশ্য বর্ণনা করেন, শব্দের পুনরাবৃত্তি করে দৃশ্য বর্ণনা অসম্পূর্ণ রাখেন। অল্প কথায় যে দৃশ্য বর্ণনা করা যেত, তিনি অতিকথনে মূল দৃশ্যটিকেই অপূর্ণ রাখেন। নাটকের দৃশ্য বর্ণনা এমনিতেই কষ্টকর, কারণ নাটক কর্ম প্রধান, বর্ণনা প্রধান নয় অতি বর্ণনা নাটকের কর্মের (Action) অগ্রগতিকে ব্যাহত করে। তাই নাটকের দৃশ্য বর্ণনা হওয়া উচিত দ্রুত ব্যাখ্যা সম্বলিত। শেক্সপিয়র, তার দৃশ্য বর্ণনাকে সংক্ষিপ্ত না করে তাকে বরং আড়ম্বরপূর্ণ শব্দে দীর্ঘ করেন।
শেক্সপিয়রের বহুল ব্যবহৃত সংলাপগুলো খুব দুর্বল শীতল কারণ স্বাভাবিক প্রকাশেই তাঁর দক্ষতা বেশি। অন্য নাট্যকারদের অনুকরণে যখনই তিনি অতি ব্যাখ্যায় জড়িয়ে পড়েন তখনই তিনি প্রসঙ্গানুক্রমিক না হয়ে, তাঁর সঞ্চিত জ্ঞান-প্রদর্শন ব্রতী হন। ফল হয় পাঠকের করুণা, বিরক্তি লাভ। 
কখনো কখনো তিনি এমন সব অযৌক্তিক আবেগে (sentiment) জড়িয়ে পড়েন যা তিনি সঠিক প্রকাশও করতে পারেন না আবার ছেড়েও দেন না। নিষ্ফলভাবে তাদেরকে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করে অবশেষে তাদেরকে জটিল শব্দে জড়িয়ে, পাঠোদ্ধারের জন্য যাদের প্রচুর অবসর আছে এমন বিজ্ঞ পাঠকদের হাতে ছেড়ে দেন।
জটিল শব্দ ব্যবহার করে তিনি গভীর ভাব পরিস্ফুটিত করতে পারেন না বা সফল কোনো রূপ-বন্ধও সৃষ্টি করতে পারেন না, সব সময় শুধু বাক্যটিকেই ভারী করে তোলেন। সামঞ্জস্যপূর্ণ শব্দ ব্যবহার তিনি প্রায়ই অবহেলা করেন। আপাত শ্রুতিমধুর এসব ভারী বাক্য দিয়ে তিনি তুচ্ছ, অশালীন, পাঠকের কাছে অগ্রহণযোগ্য ভাবেরই প্রকাশ করেছেন। উচ্চমানের এই কবির ভক্তরা সঙ্গত কারণেই অভিযোগ করেন যে, যখন শেক্সপিয়র তার প্রকাশভঙ্গির শিখরে পৌঁছে যান তখনই ঘটনার অসামঞ্জস্যতায় তিনি পাঠকদের হতাশ করেন। যখনই তিনি প্রায় শ্রেষ্ঠতায় পৌঁছে যান, তখনই যেন তিনি তাতে রাশ টানেন। ভীতি করুণা যখনই তুঙ্গে পৌছে তখনই শেক্সপিয়রের ভাষায় নেমে আসে অসাড়তা, দ্ব্যর্থকতা, অলস পাণ্ডিত্য।
কথার কারসাজি (quibble) শেক্সপিয়রের রচনায় তেমনি বহুল ব্যবহৃত যেমন কোনো পথ হারা পথিকের সামনে কোনো আলেয়ার আলো, যতই সে আলো দেখে আগায় ততই সে কাদা-জলে ডুবে। আলেয়ার মোহন আলো এমনি তাকে মোহাবিষ্ট করে, সে মোহন আলোর দিকেই সে এগিয়ে যায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে। শেক্সপিয়রের মোহও তেমনি। যে কোনো দৃশ্যের সংলাপেই তিনি কথার কারসাজিতে জড়িয়ে পড়েন। সে দৃশ্য গম্ভীর বা লঘু যে রকমই হোক না কেন, মূল ঘটনাকে অসমাপ্ত রেখে তিনি কথার কারসাজিতেই মেতে থাকেন। যেন এক সোনার আপেল, যে কোনো কিছুর বিনিময়েই তার তা চাই। কথার কারসাজিটি যত জৌলুসহীনই হোক, কথার কারসাজিতেই (quibble) যেন তাঁর পরামানন্দ, প্রয়োজনে তার জন্য তিনি যুক্তি, বুদ্ধি, সত্যকেও বিসর্জন দেন। ক্লিওপেট্রার (Cleopatra) মতন বিশ্ব হারিয়েও তিনি সন্তুষ্ট। কথার কারসাজিকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি যেন মূল নাটকটিও হারাতে প্রস্তুত।
বিষয়টি বিস্ময়কর মনে হবে, আমি যদি শেক্সপিয়রের ত্রুটি আবিষ্কার করতে গিয়ে কবি সমালোচকদের তত্ত্বে বর্ণিত সময় কালের ঐক্য ভঙ্গের কথা উল্লেখ না করি। তাঁর রচনারীতিতে যে তত্ত্ব-বিচ্যুতি আছে তার জন্য তার কর্মকে আমি তত্ত্ব বিশ্লেষকদের হাতে ছেড়ে দিই। তার পক্ষাবলম্বন করে একটাই আমার বক্তব্য : দোষে গুণেই মানুষ, সমালোচকরা যেন তার ত্রুটি আবিষ্কার করতে গিয়ে তার গুণগুলোকে উপেক্ষা না করেন; তার দোষ গুণকে সমানভাবে দেখেন। কিন্তু সময় কালের ঐক্য ভঙ্গের যে অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়, সেই অভিযোগের বিরোধিতা আমি অবশ্যই করব, তার জ্ঞানের প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান রেখেই করব। শেক্সপিয়রের ঐতিহাসিক নাটকগুলো মোটেও এই বিতর্কের আওতায় পড়ে না, কারণ সেগুলো ট্র্যাজেডিও নয় কমেডিও নয় ঐতিহাসিক নাটকের সফলতার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে, যথোপযুক্ত বোধগম্য কর্ম (Action), ঘটনার বৈচিত্র্য, চরিত্রের ধারাবাহিকতা, স্বাভাবিকতা। ঐতিহাসিক নাটকে সময় কর্মের কোনো ঐক্যের প্রয়োজন হয় না, তেমন আশাও করা হয় না।
তার অন্যান্য নাটকে তিনি অ্যাকশনের ঐক্য রক্ষা করেন। তাঁর প্লট সরলভাবে নির্মিত, তাতে কোনো জট নেই, নেই জট উন্মোচন চেষ্টাও। তিনি কোনো কিছু লুকিয়ে রেখে তা পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা করেন না। তার চিত্রকল্প (Plot) গুলো বাস্তবনিষ্ঠ। তার চিত্রকল্প গুলোতে এ্যারিস্টটল নির্দেশিত; শুরু, মধ্য অন্ত আছে। একটি ঘটনা আরেকটির সঙ্গে জড়িত এবং গল্পের উপসংহারও টানা হয়, সরলভাবে। কিছু বিষয়কে উপেক্ষা করতেই হয়; যেমন অন্য নাট্যকারদের গল্পগুলো মঞ্চে শুধু সময় কাটায়, বেশি কথা বলে, শেক্সপিয়রের গল্পগুলোতে তেমন বাহুল্য নেই। গল্পের শেষে পাঠকের প্রত্যাশাপূর্ণ হয়
স্থান কালের ঐক্য তত্ত্বকে তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি; সম্ভবত এই তত্ত্বটিকে বিশ্লেষণ করে দেখলে তার তেমন গুরুত্বও থাকে না অথচ করনেইলের [Corneille - পিয়ের কর্নেইল (১৬০৬-১৬৮৪), ক্লাসিকাল ফরাসি নাট্যকার] যুগ থেকে, নাট্যকার দর্শকদের যথেষ্ট কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তত্ত্বটি অনুসৃত হয়ে আসছে। ধরে নেয়া হয়েছিল, স্থান কাল ঐক্যতত্ত্বটি নাটককে বেশি বিশ্বাসযোগ্য করবে। সমোলোচকদের মতে, কয়েক মাস, কয়েক বছর ধরে চলা ঘটনা নাট্য দৃশ্যে মাত্র তিন ঘণ্টায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা অসম্ভব। দর্শকরা নাটক দেখা অবস্থাতেই, রাজদূতরা দূরবর্তী রাজ্যের মধ্যে আসা-যাওয়া করে, সৈন্যরা নগর অবরোধ করে বা অবরুদ্ধ কেউ ফিরে আসে। যে জুটিকে প্রেম করতে দেখা গেল তারাই তাদের পুত্র বিয়োগে সন্তাপ করে। এত বেশি সময়ের ব্যবধানে এতসব ঘটনা মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে দেখে দর্শক মন বিদ্রোহ করে এবং তা বাস্তবসম্মত বলেও মনে হয় না। সমালোচকদের মত এরকমই। দর্শকরা যারা নাটকের প্রথম দৃশ্যটি আলেকজান্দ্রিয়ায় ঘটতে দেখেছে, তারা পরের দৃশ্যটি রোমে দেখে তা বিশ্বাস করবে না কারণ এত দূরত্ব এত অল্প সময়ে মেডিয়ার ড্রাগনদের (dragons of Medea) পক্ষেও অতিক্রম করা সম্ভব নয় অথচ দর্শক যেখানে বসে ছিল সেখানেই আছে। দর্শক নিশ্চিত জানে তার স্থান বদলায়নি, এও জানে, স্থান নিজে নিজে বদলায় না। একটু আগে যে স্থান থিবিস (Thebes) ছিল একটু পরেই তা পার্সিপোলিস (Persepolis) হয়ে যেতে পারে না। একইভাবে সময়ও বদলে যেতে পারে না। সমালোচকরা অনুল্লেখ্য নাট্যকারদের নাটক নিয়ে এরকম সমালোচনায়ই উচ্ছ্বসিত হন। এর কোনো প্রতিবাদ হয় না।
শেক্সপিয়রের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে সমালোচকদের এসব ঠুনকো সমালোচনা খণ্ডন করার এখনই সময় নাটককে সব সময় সর্বৈব বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনো নাটকই কোনো কালে তেমন ছিল না। অতএব, প্রথম দৃশ্যে আলেকজান্দ্রিয়াকে রেখে দ্বিতীয় দৃশ্যে রোমে স্থানান্তরিত করলে দর্শক মনে তার কোনো প্রভাব পড়ে না। কারণ প্রথম দৃশ্যে দর্শক আলেকজান্দ্রিয়ায় (Alexandria) স্থিত হয়, তার কল্পনা মিশর যাত্রা করে এবং এন্টনি ক্লিওপেট্রার (Antony and Cleopatra) যুগে নিজেকে কল্পনায় নিয়ে যায় যে দর্শক এতদূর কল্পনা করতে পারে, সে আরও বেশি কল্পনা করতে পারবে। যে দর্শক মঞ্চকে একবার মিশরের টলেমির প্রাসাদ (palace of the Ptolemies) ভাবতে পারে এক ঘণ্টা পরে তাকে গ্রিস এর অ্যাক্টিয়াম অন্তরীপ (promontory of Actium) কল্পনা করা তার জন্য কঠিন কিছু নয় আর, তা যদি ইচ্ছাকৃত ভুলে যাওয়াও হয় তাও গ্রহণযোগ্য কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে যাওয়ার কোনো পরিধি নেই। দর্শক-মনকে যদি একবার আলেকজান্ডার বা সিজারের (Alexander and Caesar) যুগে স্থাপিত করা যায়, যদি বুঝানো যায় মোমবাতির আলোয় সজ্জিত একটা কক্ষই হচ্ছে ফার্সেলীয়ার [(Pharsalia - খৃ: পূ: ৪৮ অব্দে পম্পির বিরুদ্ধে সিজারের যুদ্ধ জয়ের স্থান)] সমতল ভূমি বা গার্নিকাস নদীর তীর [(bank of Granicus - এশিয়া মাইনরের একটি নদীর নাম।)], দর্শক-মন তখন সব জাগতিক যুক্তি-বুদ্ধি সত্যের ঊর্ধ্বে উঠে যায় কল্পনার এমন উচ্চতায় দর্শক-মন একবার পৌছে গেলে, দর্শককে প্রবহমান সময় হিসাব করতেই হবে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। যে দর্শক অনায়াসে মঞ্চে প্রদর্শিত সব কিছুকেই ধারণ করতে পারে তার পক্ষে এক ঘণ্টাকে এক শতাব্দী ভেবে নিতে পারবে এমন ধরে নেয়ার কোনো যুক্তি নেই। মূল কথা হচ্ছে, দর্শকরা মঞ্চকে, মঞ্চই ভাবে। প্রথম দৃশ্য থেকে শেষ দৃশ্য পর্যন্ত মঞ্চ মঞ্চই, অভিনেতারা শুধু অভিনেতাই এরকম ভাবতে তারা অভ্যস্ত। দর্শকরা নাটক দেখতে আসেন অভিনেতাদের সংলাপ শোনার জন্য, নাট্টক্রিয়া (Action) দেখার জন্য। সংলাপগুলো উচ্চারণে স্বরগ্রামের উত্থান-পতননাট্টক্রিয়াএর সঙ্গে জড়িত, আরনাট্টক্রিয়াকোনো স্থানের সঙ্গে জড়িত। পরিবর্তিত যে সবনাট্টক্রিয়ানাটককে সমাপ্ত করে তাদের সম্পাদনের স্থানও ভিন্ন হয়, কখনো কখনো স্থানটি দুরস্থিতও হয় স্থানটি কখনো এথেন্স (Sicily) হয়, কখনো সিসিলি (Athens) হয় দর্শক স্বচ্ছন্দে তাকে মঞ্চই ধরে নেয়
                                                         Next Part

No comments:

Post a Comment

Blog Archive