Total Pageviews

Thursday, June 18, 2020

Discussion about Seize the day – Saul Bellow (Bangla)

Discussion about Seize the day – Saul Bellow (Bangla)

Discussion about Seize the day – Saul Bellow (Bangla)
Seize The Day উপন্যাসিকায় পিতা-পুত্রের মধ্যে যে বিরোধ তাকে আমরা এক কথায় বলতে পারি সাফল্য-ব্যর্থতা, পরিপূর্ণতা-হতাশা এবং বাস্তববাদিতা-রোমান্টিকতার চিরন্তন বিরোধের প্রতীকী চিত্রায়ণ। ডা. এ্যাডলার আত্মমগ্ন অশতিপর বৃদ্ধ পিতাঅর্থের ঘাটতি নেই, ঘাটতি আছে মায়াময়তা আর বাৎসল্যে। অন্যদিকে টমি পিতৃস্নেহ-পিপাসু মাঝবয়েসী পুত্র। পিতার কাছ থেকে সাহায্য নেবার বয়স অনেক আগেই পার হয়ে গেছে, আর সাহায্য চেয়ে পাবার মত কোন ভাল কাজ সে করতে পারেনি। তবে একটা ব্যাপারে সে খুব ভাল করেই জানে; নিজের বুভুক্ষু আত্মার সাথে একটা বড়শীতে বেঁধা ক্ষুধার্ত মাছের মিল খুঁজে পায়, ওই মাছ যেমন জীবনতৃষ্ণায় কাতর তেমনি উইলহেম পিতার স্নেহ ভালবাসা পাবার আশায় বারবার সামনে এসে দাঁড়ায়, তীব্র চাপা যন্ত্রণায় মোচড় খায় Saul Bellow' নিজের ভাষায়,
"When a fish strikes the line you fell the live force in your hand. A mysterious being beneath the water, driven by hunger, has taken the hook and rushes away fights writhing.
আমেরিকার অতি আধুনিকতার শীতল আবহে পিতৃস্নেহের উষ্ণতায় নিজেকে উদ্ভাসিত করতে উইলহেম যখন তার পিতার কাছে এসে দাঁড়ায়, তখন ডাক্তার পিতা তাকে শান্ত করতে চান ডাক্তারি পরামর্শ দিয়ে। অন্যান্য রোগীদের সাথে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দেন। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। তাই পিতৃস্নেহের জন্যে আকুল হৃদয় যখন ডা. টামকিনের কাছ থেকে সমবেদনা পায়, টামকিন যখন উইলহেমের অপূর্ণতাটা কোথায় বোঝার ভান করে, তখন ওর কথায় নির্ভর না করে পারে না। সে টামকিনকে বেছে নেয় surrogate বাবা হিসাবে।
উইলহেম আর তার বাবার যে বিরোধ, যে মতপার্থক্য তার জন্যে শুধুমাত্র বাবা দায়ী একথা সম্পূর্ণ সত্য নয়দায়ী পুরো সমাজ ব্যবস্থা। এটা এমন এক সমাজ যেখানে নিবিড় পারিবারিক বন্ধনকে মনে করা হয় বন্দীত্ব। ছেলেমেয়ের প্রতি দায়িত্ববোধকে ভাবা হয় শৃঙ্খল, বাড়তি বোঝা। বয়স আঠারো পেরোতে না পেরোতেই ছেলেমেয়ে নিজেদের স্বাধীনতা জাহির করতে পারে। তাদের ভালমন্দে মা-বাবা নাক গলান না (উইলহেম যখন। কলেজের পড়া ছেলে হলিউডে পাড়ি জমিয়েছিল তার মা-বাবা তেমনভাবে বাধা দিতে পারেননি। এভাবেই পিতা-মাতা আর সন্তানসন্ততির মধ্যে তৈরি হয় একটা দেয়াল, দেয়াল পুরাতন আর নতুনের মাঝের বিরোধের দেয়াল নয়, দেয়ালটা গড়ে ওঠে পরিবারসচেতনতার ঘাটতি বা lack of family sense থেকে পিতা বা পুত্র দুজনেই এই দেয়ালের ইটের যোগন দেয়।
আধুনিক, হৃদয়হীন নগর-জীবনের ইটকাঠে বন্দী উইলহেম বারবার জলহস্তি বলে গালি দেয় নিজেকে। এটা আমাদের Franz Kafka' Metamorphosis-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানে যান্ত্রিক সভ্যতার চার দেয়ালে বন্দী Gregor রূপান্তরিত হয় এক গুবরে পোকায়। দেয়ালের বাইরে বাবা-মা-বোন কেউ তাকে বুঝতে পারে না। সবাই একসময় তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কারণ ওরা জানে গ্রেগরকে আর তাদের প্রয়োজন নেই, সে তার উপার্জন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, গ্রেগরের মৃত্যুর পর তাই পুরো পরিবার হাফ ছেড়ে বাঁচে। গ্রেগর আর উইলহেমের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে মিল তা হল দুজনেই প্রচণ্ড আত্ম-সচেতন। জীবনের শত দুর্বিপাকেও নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে যেমন জানে তেমনি পরিবারের অন্যদের অবস্থানের যথাযথ মূল্য দেয়। গ্রেগর বারবার পরিবারের প্রতি ভালবাসা আর দায়িত্ববোধ প্রমাণ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, উইলহেমও তেমনি মনেপ্রাণে বুঝতে পারে বাবা মারা গেলে সে আর তাকে ফিরে পারে না। কিন্তু দুজনের কেউই তাদের সত্যিকারের মনের অবস্থাটা পরিবারের অন্যদের জানাতে পারে না। আর এই বুঝতে না পারা বা বোঝতে না পারার কারণে জন্ম হয় বিচ্ছিন্নতাবোধ বা ‘sense of alienation’-এর। এই বিচ্ছিন্নতাবোধ পারিবারিক বন্ধনকে শিথিল করে দেয়। ভাবতে অবাক লাগে উইলহেম মায়ের মৃত্যুর তারিখ এমনকি সালটা পর্যন্ত ভুলে গেছে। ডা. এ্যাডলারও মনে করতে পারেন না। অতশত ভাববার সময় নেই তার। সবারই নিজ নিজ জীবনের বোঝা বইতে হয়, কারণ তিনিও তো একদিন মৃত্যুবরণ করবেন। এটা এ্যাডলারের যুক্তি। তবে উইলহেমের মধ্যে কিছুটা হলেও মায়ের প্রতি ভালবাসা ছিল। মায়ের সমাধির পাশের বেঞ্চিটা কে বা কারা ভেঙ্গে দিয়েছিল, নিজের সামর্থ্য নেই, চায় বাবা ওটা ঠিক করে দিক। কিন্তু এ্যাডলার বিষয়টার দিকে আমলই দেন না। এত কিছুর পরেও অন্য যে কোন আমেরিকান পিতার মত পুত্রের সাফল্য নিয়ে অহেতুক গর্ব করতে পিছ-পা নন। ছেলের উপার্জন যে পাঁচ অংকের কোঠায় এটা তাঁর বন্ধু মি. পার্লসকে জানাতে একটুও দেরি করেন না। যে কোন প্রকারে হোক নিজের পরিবার নিয়ে গর্ব করা চাই।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে উইলহেমের মধ্যে আমরা এক প্রতিবাদী পুত্রের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। সে যেন বিংশ শতাব্দীর Robinson Crusoe এর মতই বাবার আদেশ অমান্য করে পাড়ি জমিয়েছে নিজের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র প্রমাণের প্রবল আকাক্ষা আর উচ্চাভিলাষ নিয়ে। ক্রুসোর মতই মানুষ হিসাবে উইলহেম রোমান্টিক, কিন্তু সে জানে না বিংশ শতাব্দীর জীবন অনেক জটিল। এখন সফল হতে হলে মানুষকে বাস্তববাদী হতে হয় ঠিক তার বাবার মত।
উপন্যাসিকার প্রেক্ষাপট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকা। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই সময়ে সারা বিশ্বজুড়ে মানুষ আরো বেশি বস্তুবাদী হয়ে ওঠে, অর্থলিপ্সা চরম সীমা ছাড়িয়ে যায়। পর পর দু'টো বিশ্বযুদ্ধে মানুষ দেখেছে কীভাবে অর্থ আর ক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে। এর প্রভাব মানুষের মনের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মানুষের মনে জন্ম নেয় একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ আর বিচ্ছিন্নতাবোধ। পূর্বের কোন সামাজিক বন্ধনই আর মানুষকে বেঁধে রাখতে পারে না। সবার চোখে যেন ঠুলি পরিয়ে দেয়া হয়েছে। বিবাহ তাদের কাছে পায়ের বেড়ি, গিট খুলতে পারলেই যেন প্রাণ বাঁচে। একে অন্যকে আর আগের মত বিশ্বাস করতে পারে না। সবসময় সন্দেহ, লোকটা ঠিক বলছে তো? আবার কিছু জানবার আগ্রহ হলেও সবসময় জিজ্ঞাসা করা যায় না, কে কী ভেবে বসে। সবার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র আছে, সবাই স্বাধীন।
Seize The Day উপন্যাসিকায় আমেরিকা সম্পর্কে ওই সব মন্তব্য সুপ্রতিষ্ঠিত। কেন্দ্রীয় চরিত্র উইলহেমই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। T.S. Eliot-এর Love Song of Alfred J. Prufork কবিতায় Prufork এর সাথে উইলহেমের মিলটাও একই কারণে। দুজনেরই মাঝবয়েস, চেহারায় আগের সে ঔজ্জ্বল্য নেই, তারা কেউ বৃদ্ধ নয়, আবার যৌবনের বাঁধভাঙা তেজও স্নান। মাঝবয়সী প্রেমিক Prufork শত চেষ্টা করেও ইপ্সিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারে না। জটিল আধুনিক জীবনের জালে বন্দী হয়ে অভিব্যক্তির ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে সে। উইলহেমের বেলায়ও হয় তাই। সমস্যা সংকুল জীবনের সহস্র না-বলা কথা দলা পাকিয়ে থাকে বুকে। বার বার চেষ্টা করেও বাবা বা স্ত্রী কাউকে বোঝাতে পারে না।
উইলহেম কোন বিদ্রোহী চরিত্র নয়। নায়কোচিত কোন গুণ আমরা তার মধ্যে দেখি না। পুরো কাহিনীটা জেনে তাকে বড় জোর একজন রোমান্টিক চরিত্র হিসাবে দাঁড় করানোর জন্য কতকগুলো ক্ষণভঙ্গুর যুক্তি দেখানো যেতে পারে। নায়ক হিসাবে সে Antihero. তার চরিত্রের মাহাত্ম অসাধারণ কোন গুণাবলীতে নয়, বরং সে যে অন্য যে কারো মত, কিংবা যে কারো চেয়ে বেশি সাধারণ সেটাই তার অসাধারণত্ব।
Sauf Bellwo'এর অধিকাংশ চরিত্র প্রতীকী অর্থে কারারুদ্ধ, তবে আক্ষরিক অর্থেই ব্যাঙ্গাত্মক। Dangling man-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র জোসেফকে আমরা তার কক্ষে আটকা পড়ে থাকতে দেখি। সে বলে, “, in this room separate, alienated, distrustful.” The Adventure of Augie March একবার বাইরে থেকে Augie সজোরে বার বার নক করার পরও কক্ষগুলো খুলে কেউ বেরিয়ে আসে না, বন্ধ থাকে। তেমনি Seize The Day উপন্যাসিকায় Hotel Glorianaতে যে-চরিত্রগুলোর সাথে আমরা পরিচিত হই, সবাই যেন এক মায়াপুরীতে বন্দী হয়ে আছে। সবাই আত্মকেন্দ্রিক, নিজেকে ঘিরেই সবার চিন্তা। প্রত্যেকটা চরিত্র (এমনকি উইলহেমও কিছু জায়গায়) ব্যাঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এ্যাডলার, টামকিন, রুবিন, মি. ্যাপাপোর্ট, মি. পার্লস, মার্গারেট, দালালি অফিসের ম্যানেজার-এরা সবাই তথাকথিত আধুনিক সভ্য মানুষের প্রতিনিধি। এদের কথা মনে হতেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে কতকগুলো অসম্পূর্ণ মানুষের প্রতিচ্ছবি-ভাঙা ভাঙা এক অদ্ভুত ভাষায় এরা কথা বলে। তাদের যে-বন্দিত্ব সেটা স্ব-আরোপিত। প্রত্যেকে নিজ নিজ সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন, শিকড়বিহীন। Hotel Gloriana’য় যাদের সাথে পাঠকের পরিচয় হয় তাদের ছিন্নমূল বললে ভুল হয় না। এদের কারো কোন পিছুটান নেই, নেই কোন দায়িত্ববোধ। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। উইলহেম বয়স এবং মানসিকতা দুদিক থেকেই এর চেয়ে আলাদা।
উইলহেমের মানসিক গঠন অন্যদের চেয়ে আলাদা, কারণ সে ভালবাসতে পারে। এই ভালবাসা নিজের পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে নিউইয়র্কের অপরিচিত জনস্রোতের দিকে ধাবিত হয় সবাইকে এক বাঁধনে বাঁধবার জন্যে। তার নিজের একটা দর্শন epiphany আকারে দানা বাঁধে অবচেতন মনে। তার বিশ্বাস, পৃথিবীর প্রত্যেকটা প্রাণী, সব ক্ষুদ্র অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একটা ‘larger body’-এর অংশ। তাঁর দর্শনটা উইলহেম স্বীকার না করলেও ডা. টামকিনের এখানে-আর-বর্তমানে (Here-and-Now) তত্ত্বের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায়। Time Square-এর নীচে বেজবলের জন্যে টিকেট সংগ্রহ করতে গিয়ে আধো অন্ধকারে অচেনা জনতার নাক-মুখ-চোখের দিকে তাকিয়ে বিদ্যুৎ খেলে যায় মাথায়। অন্তরের গভীরতম প্রদেশ থেকে অফুরন্ত ভালবাসা উপচে পড়ে অন্ধকারে বিবর্ণ চেহারার এই অপরিচিত মানুষগুলোর জন্যে,
"He loved them. One and all, he passionately loved them. They were his brothers, his sisters. He was imperfect, disfigured himself, but what difference did that make if he was united with them by this blaze of love?"
বিশ্ব-ভাতৃত্ববোধের এক অমোঘ বাণী যেটা স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও উইলহেমের মনে আসে। মানুষ যে স্বাতন্ত্র্যবোধের ছোট্ট কুঠুরীতে বাস করতে করতে গ্রেগরের মত গুবরে পোকা হয়ে যাচ্ছে; নিজের সত্তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তা থেকে মুক্তির উপায় এই ভাতৃত্ববোধ। এই অনুভূতিটা খুব অল্প সময়ের জন্য উইলহেমের মনে স্থায়িত্ব পায়। একসময় আবার নিজের পূর্বের সংকীর্ণ সত্তায় ফিরে যায় সেও, কিন্তু কাহিনীর অন্যান্য চরিত্রের সাথে বড় যে পার্থক্যটা চোখে পড়ে সেটা হল তার হৃদয়টা অতিরিক্ত রকমের কোমল যেটা তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। পৃথিবীর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রত্যেকটা ঝড় তাকে আন্দোলিত করে, প্রত্যেক ফোঁটা বৃষ্টিতে তার চোখ জলে ভরে আসে। কাউকে দুঃখ দেয়া তার ধাতে নেই। এমনকি যে মরিস ভেনিস তাকে ধোঁকা দিয়েছিল তার বিপদের সময় প্রচণ্ড মায়া হয় ওর। দুঃখ হয় নিটা ক্রিস্টেনবেরির জন্যেও। ওর যেমন তাতে নিউইয়র্ক-এর মত শহরে সে হয়ে ওঠে অবাঞ্ছিত, অপ্রয়োজনীয়। এখানে টামকিন যে তাকে ঠকাবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এই নগরজীবন টামকিন আর এ্যাডলারদের জন্যে, যারা টুকরো টুকরো অংশ নিয়ে সুখী হয়, উইলহেমের মত যারা এখানে একটা Unified world-এর স্বপ্ন দেখে তাদের পথে বসতে হয় অচিরেই।
সমালোচক Keith Opdahl-এর মতে "The ambiguity of Wilhelm's drowning, which is both a failure and a triumph is the central problem of Seize The Day."
ডফুবে যাওয়ার (drowning) দু'টো চিত্রকল্প (imagery) গল্পের শুরু শেষে কেন্দ্রীয় চরিত্রকে একটা বৃত্তে বন্দী করে রাখে। কাহিনীর শুরুতে বলা হয়, The elevator sank deeper and deeper', আর শেষ কয়েক লাইনে বলা হয়েছে, 'He ..... sank deeper than sorrow, through torn sobs and cries toward the consummation of heart's ultimate need.'
তবে এই দুটো চিত্রকল্পের মধ্যে পার্থক্য অনেক। লিফটে সে যখন নীচের দিকে নামছে সেটি তার আর্থিক আর মানসিক পতনের প্রতীক। কিন্তু গল্পের শেষাংশে উইলহেমের ভুবে যাওয়া মানে ডুবে যাওয়া নয়। দুঃখবোধ এখন তার কাছে তুচ্ছ। তার তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের চূড়ান্ত বাসনা সম্পর্কে সে পুরোপুরি নিশ্চিত। তার দুচোখ দিয়ে যে-জল গড়িয়ে পড়ছে সে তার ভাষা বোঝে। সব অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎ তার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।।
লেখক আরো এমন কিছু চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন যেগুলো ‘grim humour’-এর পর্যায়ে পড়ে। এদের মধ্যে অন্যতম উইলহেমের ঘাড়ে টামকিনের চেপে বসার শব্দচিত্রটি। উইলহেম প্রথমে মনে করেছিল সে বোঝা হয়ে আছে টামকিনের। কিন্তু ঠকবার পর ভুল বুঝতে পারে  “I was the man beneath: Tamkin was on my back and I Thought I was on his. He made me carry with him too, besides Margaret. Like this they ride on me with hoofs and claws."
প্রত্যেকটা বিচারবোধসম্পন্ন আধুনিক মানুষের মূল সমস্যা এখানেই। প্রথমত তাকে নিজের অস্তিত্বের বোঝা বইতে হয়, এরপর অন্যরাও চেপে বসে তার উপর, যত দিন যায় এই বোঝার ভার তত বাড়ে।
যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষের অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দক্ষ শিল্পীর তুলির আঁচড়ে। টেলিফোন বুথে উইলহেমের সাথে মার্গারেটের কথোপকথন তার মধ্যে একটি। টেলিফোনের ওই বুথটা আবেগহীন যান্ত্রিক সভ্যতার মূর্ত প্রতীক। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে কথা হয়, পুরোটা হিসাব-নিকাশ আর লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত। ওদের কথাবার্তা নির্জীব, যান্ত্রিক। এক সময় কথার মাঝেই খট করে রিসিভারটা নামিয়ে রাখে মার্গারেট। বোঝা-পড়া হবার আর কোন সুযোগ নেই। দুজনের মধ্যে যে দেয়াল তৈরি হয়েছিল সেটা আরো পুরুত্ব পায়।
উইলহেমের নিমজ্জিত হবার চিত্রকল্পের সাথে জলের চিত্রকল্পটাও জড়িত। নিজেকে জলহস্তি বলে উইলহেম ব্যাঙ্গ করলেও পানি তার একেবারেই অসহ্য। একজন ডুবন্ত মানুষ পানি থেকে যেভাবে আতঙ্কগ্রস্ত হয় তর বেলায় হয় তাই। খাবার আগে হাত ধোয়া তার ধাতে সয় না। হাতে পানি লাগানো এড়াতে সে ইলেক্ট্রিক রেজার ব্যবহার করে। পানিকে কেন এত ভয় উইলহেমের? আমরা জানি, পানি পবিত্রতার প্রতীক। খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী পানিকে দেখা হয় আত্মার শুদ্ধির উপায় হিসাবে। উইলহেম দুঃখ প্রকাশ করে বলে, পশ্চিমি জগতে কেউ যদি এক গ্লাস পানি চায় তাহলে সৃষ্টির শুরু থেকে হিটলার পর্যন্ত পুরো মানব ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে। এই ধারণাটা উইলহেমের যতটা না তার চেয়ে Bellow’রই বেশি। নিউইয়র্ক শহরটা যেন Baudelaire-এর Unreal City আর এখানকার মানুষগুলো T.S. Eliot-এর The waste land-এর অধিবাসীদের মত আত্মিকভাবে তৃষ্ণার্ত। শুধু উইলহেম নয়, উপন্যাসিকার যে-সব চরিত্রের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে, সবাই একটা তৃষিত হৃদয় নিয়ে বসে আছে। পার্থক্যটা হল, উইলহেম অন্যদের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল, আগেই পেয়ে গেছে তৃষিত আত্মার বার্তা।
শুধু ভাবগম্ভীর চিত্রকল্প নয়, ব্যঙ্গচিত্র অংকনেও Bellow’ পারদর্শিতা অসাধারণ। কাহিনীতে যে-চরিত্রগুলোর সাথে আমাদের পরিচয় হয় তারা যান্ত্রিক সভ্যতার যন্ত্রমানব। এদের মধ্যে মিঃ ্যাপাপোর্ট চরিত্রটি আমাদের সবচে বেশি নজর কাড়েন। নিজের ইচ্ছা অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে ভালবাসেন। ভদ্রতাবোধ বলে কিছু নেই। তিনি প্রত্যেক আধুনিক Hollow Man-এর প্রতিকৃতি। ্যাপাপোর্ট চোখে দেখতে পারেন না। বোর্ডের মূল্যতালিকা থেকে নিজের পণ্যের মূল্য গুনে নেন উইলহেমের কাছ থেকে, কিন্তু পণ্যবাজার সম্পর্কে এতটুকু উপদেশ দিতে তিনি নারাজ। তার চরিত্রের মাধ্যমে লেখক অন্য এক উদ্দেশ্য সিদ্ধি করেন। উইলহেমের আত্মিক অন্ধত্ব সম্পর্কে আমাদের ইঙ্গিত দেন। চোখ আছে কিন্তু সে দেখতে পায় না। অন্যদিকে শারীরিক অন্ধত্ব অর্থ উপার্জনে কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, কারণ তিনি যান্ত্রিক সভ্যতার সাথে মানিয়ে নিত পারেন, উইলহেম পারে না। সমস্ত আবেগ বিবর্জিত হয়ে তাকে ঠকিয়ে কিংবা আত্মকেন্দ্রিকতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ডা. টামকিন বা ডা. এ্যাডলারেরও সাফল্যের দ্বারে পৌছাতে কষ্ট হয় না।
তবু ব্যর্থতা আর মানসিক যন্ত্রণারও একটা গঠনমূলক দিক আছে। এটা আমাদের জীবন সম্পর্কে শিক্ষা দেয়, জীবনের নানা অজানা অধ্যায় আমাদের সামনে তুলে ধরে। কাহিনীর শুরু থেকে উইলহেমের তীব্র মানসিক চাপ, অনুশোচনা আর যন্ত্রণার গিট খোলা হয় ধীরে ধীরে। আর এভাবেই পাঠককেও জড়ানো হয় সেই অনুভূতির সাথে, তবে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। কাহিনীর শেষে সব জমাট বাঁধা দুঃখ যখন চোখের জল হয়ে বেরিয়ে আসে তখন পাঠক নিজেও এক অদ্ভুত অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এরই নাম হয়তো Cathersis-ট্রাজেডিতে যার সমাপ্তি হয় দর্শকের Pity এবং fear এর মাধ্যমে।
Bellow’ অংকিত নগর-জীবনের চরিত্রদের সবচেয়ে যে বড় মিল তা হল এরা সবাই বর্তমানকে নিয়ে ব্যস্ত। টামকিন যেমনটা বলে,
"The past is no good to us. The future is full of anxiety, Only the present is real the here-and-now. Seize The Day."
তবে Bellow' দর্শন আর টামকিনের দর্শন এক নয়। টামকিনের মুখ। দিয়ে তিনি শুধু সাধারণ আমেরিকানদের যুক্তিটাই তুলে ধরেছেন। এরা সব বর্তমানের পূজারি, বর্তমানের চাকায় পিষ্ট হয়ে সত্তার অন্তঃসার বিসর্জন দেয় এরা। ডা, টামকিন এদেরই প্রতিনিধি। তার মতে
Nature only knows one thing, and that's the present, present, present, eternal present, like a big, huge, giant wave you must go along with the actual, the Here-and-Now."
অনন্ত বলতে এরা বোঝায় বর্তমানকে, বর্তমান মুহূর্তকে। অনন্ত সময়কে দিন, মাস, ঘণ্টা সেকেণ্ড আর মুহূর্তে ব্যবচ্ছেদ করে মৃত্যুকূপ খোঁড়ে নিজেরাই।
চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশকে Sarte, Kafka, আর Camus-এর মত বিখ্যাত সাহিত্যিকগণ অস্তিত্ববাদী দর্শনকে তাদের উপন্যাস আর নাটকের বিষয়বস্তু হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পৃথিবীর উপর দিয়ে ঘটে যাওয়া পরপর দুটো বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এক্ষেত্রে অনেকটা দায়ী। ওই দুটি বিশ্বযুদ্ধ মানুষের অস্তিত্ব কতটা ভঙ্গুর আর অনিশ্চিত তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অস্তিত্ববাদী দর্শন মূলত আলোচনা করে মানুষের অস্তিত্বের অর্থহীনতা সম্পর্কে সম্যক অভিজ্ঞতা এবং ওই অর্থহীনতার নিগূঢ় অর্থ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ নিয়ে। মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন সবচেয়ে বড়। সবার ঊর্ধ্বে। আমাদের মনে বেশ কিছু প্রশ্ন জাগে- আমি কে? আমি কেন? আমি কীভাবে বেঁচে আছি? আমার এই বেঁচে থাকার অর্থ কী? জড় বস্তুর থেকে আমি কীভাবে আলাদা? অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের মতে, জন্ম থেকেই মানুষের মধ্যে একটা শূন্যতাবোধ কাজ করে, প্রতিমুহূর্তে ভয়-ভীতি, হতাশা, একাকিত্ব, একঘেয়েমি সেই শূন্যতাবোধ বাড়িয়ে দেয়। এটা আসে মূলত মৃত্যুচিন্তা থেকে। মানুষ সবসময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে যখন সে বুঝতে পারে তার ভালমন্দে পৃথিবীর কিছু যায় আসে না। তারপর এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সে কঠোর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। হঠাৎই নিজের সত্তার স্বরূপ চিনতে পারে। কোন শোক বা বিলাপ নয়, সে সিদ্ধান্ত নেয় যতদিন বেঁচে থাকবে ওই সময়টাকে সে কাজে লাগাবে, জীবনের আকণ্ঠ পান করবে, তখন অস্তিত্ব আর বোঝা হয় না। নিজের মধ্যে জন্ম নেয় নতুন এক বিশ্বাস। জীবনের অর্থহীনতাই তখন নতুন এক অর্থ বহন করে। জঁ পল সার্ত, নিটসে, কাফকা বা ক্যামুর মত Saul Bellow নিজেও অস্তিত্ববাদী চিন্তার প্রভাবমুক্ত হতে পারেননি, কারণ Seize The Day' রচনাকাল ১৯৫৬, অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তখনও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। এই উপন্যাসিকায় কেন্দ্রীয় চরিত্র উইলহেমকে আমরা দেখি এক অস্তিত্ববাদী চরিত্র হিসাবে।
অস্তিত্ববাদীদের মধ্যে আবার দুটো শ্রেণী আছেকেউ আস্তিক্যবাদী, কেউবা নাস্তিক্যবাদী। উইলহেমকে আমরা প্রথম শ্রেণীর মধ্যে ফেলতে পারি। জীবনের শত টানাপোড়েনে ঈশ্বরে বিশ্বাস হারায় না সে। যে সমস্ত লেখক অস্তিত্ববাদকে তাঁদের রচনার বিষয়বস্তু হিসাবে এনেছেন তার মধ্যে অনেকেই জীবনের অর্থহীনতা বোঝনোর জন্যে নাস্তিক্যবাদী চরিত্র চিত্রিত করেছেন। প্রথমে ধরা যাক Dostoevsky Crime and Punishment-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র Raskolnikov-এর কথা। তিনি নিজেকে Nepoleon-এর মত অতিমানবীয় আসনে বসিয়ে খুন করে বসেন, শুধু তাই নয়, তার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা হয় না। অস্তিত্ববাদী নায়কের সাথে Albert Camus রচিত The Outsider উপন্যাসের Meursault চরিত্রের মিল আছে। বরং এই চরিত্রটা Raskolnikov-এর চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে। কোন কারণ ছাড়া সে খুন করে অপরিচিত এক ব্যক্তিকে, অর্থহীন একঘেয়ে জীবন থেকে মুক্তি পেতে। গুলি করা না করার (Fire or not fire) এর মধ্যে সে কোন পার্থক্য খুঁজে পায় না। দুটোর অর্থই তার কাছে সমান। এই দুই চরিত্রই নাস্তিবাদী (Nihilist) কিন্তু Bellow’ রচনা এই নাস্তিবাদ সমর্থন করে না। তাঁর Augie March-এর অগাধ বিশ্বাস-“Truth, love, bounty, usefulness, hamony'—এর সবকিছুতে। কেন কারণ ছাড়াই Camus এর Meursault একটা অপরিচিত লোককে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু Bellow-এর Herzog যথেষ্ট যুক্তি থাকা সত্ত্বেও তার স্ত্রীর প্রেমিককে গুলি করতে পারে না, যখন দেখে গার্চব্যাচ তার ছোট্ট মেয়েকে স্নান করাছে। তখন সে বুঝতে পারে জীবনের অর্থ আছে।
উইলহেমও নাস্তিবাদী নয়। তার চরিত্রের যদি কোন মহত্ত্ব থেকে থাকে সেটা হল নাস্তিবাদের বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধ। এমন এক সামাজিক আবহে সে বেড়ে উঠেছে যেখানে নাস্তিক্যবাদী হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সে তা হয়নি। সে নিজেকে দেখে বড়শিতে আটকে পড়া একটা মাছের মত-তার সত্তার গভীরে একটা টান অনুভব করে, পালাতে চায়, পারে না। তারপরও জীবনটাকে সে ভালবাসে। মা-কে সে আগেই হারিয়েছে, বাবা, স্ত্রী বা সন্তান থেকেও নেই। শেষ সম্বল সাতশো ডলার যখন খুইয়ে বসে তখন বোঝে এসবেরও একটা অর্থ আছে। আর নিছক যন্ত্রণাবোধ নয়, এখন তার যে অনুভূতি deeper than sorrow কাহিনীর শেষাংশে Bellow,  Dostoevsky' জীবনবোধের কাছাকাছি একটা ধারণা দেন।'Crime and Punishment যেমনটা দেখি Raskolnikov দুঃখকে বরণ করে আত্মমুক্তির পথে পা বাড়ায়। তেমনি Bellow মনে করেন জীবনে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হয় যন্ত্রণায় মধ্য দিয়ে। এটা যে একবার বুঝেছে, পার্থিব দুঃখ আর তাকে ছুঁতে পারে না। হৃদয়ের চূড়ান্ত প্রয়োজন (Ultimate need) কী, উইলহেম তা জানে-সেটা হল অবিশেষ ভালবাসা ভাতৃত্ববোধ বর্মের মত তাকে ঘিরে রাখে। সে বুঝতে পারে ভালবাসা তার একমাত্র অস্ত্র, উদাসী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে।
মানুষ হিসেবে উইলহেম চেয়েছিল রোমান্টিক এক জীবন কাটাতে, জীবদ্দশায় রোমান্টিকতার দেখা সে পায়নি, আর কখন পাবে বলে আশাও করে না। তাই কাহিনীর শেষে মৃত লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা রোমান্টিক মৃত্যুর স্বপ্ন দেখে সে। তার চোখ দিয়ে যে-জল গড়িয়ে পড়ে সেটা দুঃখের নয়, আনন্দের। মৃত্যুর কাছাকাছি এসে অপরিচিত মৃত ব্যক্তির সাথে নিজেকে মিলিয়ে সে নতুন এক জীবনবোধে আপ্লুত হয়। এভাবেই উইলহেমের মধ্যে ধীরে ধীরে জন্ম হয় অন্য এক অস্তিত্ববাদী উইলহেমের।

No comments:

Post a Comment

Blog Archive