Total Pageviews

Monday, March 30, 2020

আরাবি - জেমস জয়েস - Araby - James Joyce - Bengali Translation

আরাবি - জেমস জয়েস - James Joyce - Bengali Translation
আরাবি - জেমস জয়েস - Araby - James Joyce - Bengali Translation

ক্রিশ্চিয়ান ব্রাদার্স স্কুলের বালকেরা বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার পর দলে দলে বের ঝা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত নর্থ রিচমন্ড রোডটি একেবারে ঝিম মেরে পড়ে থাকে দুপাশে দোতলা বাড়ি গুলো মিলেমিশে আছে শরীরের সাথে শরীর লাগিয়ে ঘেঁষার্ঘেষি করে অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা নিরুপদ্রবে বাস করে এখানে রাস্তার একেবারে শেষ প্রাণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে ফাঁকা নিরিবিলি একটা বাদামী রঙা দোতলা বাড়ী
অনেক আগে আমাদের বাসায় একজন যাজক ভাড়া থাকতেন, পেছনের ড্রইংরুমে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সে থেকেই রুমটা আর তার পাশের অন্যান্য কক্ষ গুলো দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ, রুমণ্ডলোর ভ্যাপসা আর গুমোট অবস্থা, পেছনের রান্না ঘরে জমা ছিল রাজ্যের টুকিটাকি জিনিস আবর্জনা, সেখানে আমি মলাটে মোড়া কিছু বই পেয়ে যাই বইয়ের কাগজ গুলো  স্যাঁতসেঁতে আর পাতা গুলো কোঁকড়ানো স্যার ওয়াল্টার স্কটের The Abbot, The Devout Communnicant এবং The Memoirs of Vidocq বইগুলো আমি শেষোক্ত গ্রন্থটি পছন্দ করলাম কারণ এর পাতাগুলো হলদে হয়ে গিয়েছিল বাড়ীর পেছনে ছিল একটা জংলা বাগিচা মাঝখানে ছিল একটি আপেলগাছ আর ইস্তততঃ ছড়ানো ছিটানো কিছু আগাছার ঝোপ, এই ঝোপগুলোর একটির তল থেকে আমি কুড়িয়ে পাই আমাদের মৃত ভাড়াটিয়া যাজকের সাইকেলে হাওয়া দেয়ার পাম্পটি যাজক মহোদয় ছিলেন খুবই দানশীল মানুষ, তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তার সকল সহায় সম্পদ অর্থ তিনি দান করে গিয়েছিলেন নানা প্রতিষ্ঠানে আর তাঁর গৃহের সব আসবাব প্রত্র তিনি তাঁর বোনকে দিয়ে গিয়েছিলেন
যখন শীতের দিনগুলো ছোট হয়ে, আসতো তখন গোধূলীর আবছা অন্ধকার নেমে আসার পূর্বেই আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিতাম যখন আমরা সবাই বাড়ীর সামনের রাস্তাটায় মিলিত হতাম তখন চারপাশে নেমে আসতো কবরের মতো নীরবতা, মাথার উপরের আকাশে তখন বেগুনী আভা ধরেছে আর রাস্তার বাতিগুলো মিট মিট কনে জ্বলতো ঠান্ডা হাওয়া শরীরে এসে ঝাপটা দিতো আমাদের শরীরগুলো আবছা হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা খেলতেই থাকতাম আমাদের চিৎকার চ্যাঁচামেচি প্রতিধ্বনি তুলতো নির্জন রাস্তায় আমাদের খেলার পরিস্থিতি অনুযায়ীই আমাদেরকে শেষে নিয়ে আসতো বাড়ীর পেছনের অন্ধকারাচ্ছন্ন কর্দমাক্ত পথটাতে বাড়ী হতে ভেসে আসা গালি গালাজের ভয়ে আমরা দৌড়ে চলে যেতাম পেছনে অন্ধকারে ডুবে থাকা বাগানে যেখানে ছাইয়ের গাদার তীব্র গন্ধ ভেসে আসতো, সেই ছাই গাদার গন্ধমাখা অন্ধকারে ঘোড়ার গাড়ীর কোচম্যান তার অশ্বগুলোর দলাই মলাই করতো, আর অশ্বগুলোর লাগামের আওয়াজে সৃষ্টি হতো এক সঙ্গীতময়তা যখন আমরা রাস্তা হতে গৃহে ফিরে আসতাম তখন রান্না ঘরের জানালাপথে হওয়া আলো অঙ্গনটা আলোকিত করেছে
আশে পাশে যদি আমার চাচাকে দেখতে পেতাম তাহলে আমরা দ্রুত অন্ধকার জায়গায় লুকিয়ে পড়তাম যে পর্যন্ত না তাকে আড়াল করে বাড়ীতে ঢুকে পড়তে পারতাম কিংবা  যদি ম্যানগানের বোনটি বাইরে দরজার সামনে বের হয়ে তার ভাইকে চা পান করার জন্যে ডাকত, আমরা তাকে দেখার জন্যে উঁকিঝুঁকি দিতাম রাস্তায় আমাদের ছায়া গুলোও উঠানামা করতো আমরা তার অবস্থান এবং বাড়ীর ভেতরে চলে না যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম আমরা আমাদের ছায়া পেছনে ফেলে পরাজিতের মতো ম্যানগানের সাথে পা ফেলে অগ্রসর হতাম সে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতো, দরজার ফাক হতে বের হয়ে আসা আলোতে তার শরীরটা দৃশ্যমান হতো যে পর্যন্ত তার ভাইটি তার বশ্যতা না মানতো ততোক্ষন পর্যন্ত সে তাকে উত্যক্ত করতেই থাকতো আমি রেলিং এর সামনে দাঁড়িয়ে ওকে প্রত্যক্ষ করতাম তার শরীরে নড়াচড়াতে তার বসন আন্দোলিত হতো আর কোমল চুলের বেণীটা এপাশে ওপাশে দুলতো
প্রতিদিন সকালে আমি সামনের বৈঠকখানার মেঝেতে শুয়ে ওদের দরজার দিকে  নজর রাখতাম, জানালার দিকটা একটু ফাঁকা থাকত সেই ফাকে আমি উঁকি ঝুকি মেরে তাকে দেখতে ব্যর্থ হতাম যখন ওদের বাড়ীর দরজার সামনের সিঁড়িতে বের হতো তখন আমার হৃদয়টা উথাল পাথাল করতে থাকতো আমি দ্রুত দৌড়ে হল ঘরে গিয়ে একটি বই হাতে করে পড়ার ভান করে তাকে দেখতাম আমি সর্বদা তার বাদামী রঙা শরীরটা চোখে চোখে রাখতাম আর যখন আমরা দুজন কাছাকাছি আসতাম তখন আমি দ্রুত মনোযোগ অন্যদিকে নিমগ্ন করতাম, দ্রুত পাশ কাটিয়ে যেতাম তাকে প্রতিটি সকালেই এমনটি ঘটতে থাকতো প্রয়োজনীয় কোন কথা ছাড়া বিশেষ কোন কথাই হতোনা তার সাথে অথচ তার নামটা আমার রক্তের মাঝে ডাক দিয়ে সারা হতো স্থান কালের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তার ছবি সর্বদা একটা রোমান্টিকতাসহ আমাকে ঘিরে থাকতো শনিবার সন্ধ্যাবেলা আমার চাচী বাজারে যেতেন, আমি তাঁর সাথে ব্যাগ ট্যাগ বহন করতাম আলোকোজ্জ্বল রাস্তা ধরে আমরা হেঁটে যেতাম মাতাল লোক, দাম নিয়ে দর কষাকষি করা মহিলা আর গালিগালাজরত শ্রমিকদের ঠেলেঠুলে আমরা অগ্রসর হতাম বাক্সর ভর্তিপিগ চিকসামনে রেখে দোকানের বালকগুলো চিৎকার করে ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করতো নাকি সুরে (নাকে বাঁশী থেকে) পথ গায়করা গাইতো, চলে এসো সদলে ডনোভান রোসা' কিংবা আমাদের জনপদের কোন বিষাদ গাঁথা
এইসব শব্দাবলী বিন্দুমাত্রও আমাকে স্পর্শ করতোনা আমি ভাবতাম আমার পানপাত্র আমি নিরাপদে ছুড়ে দিতে পারবো শত্রু বুহ্য লক্ষ্য করে বিপদকালীন প্রার্থনা কিংবা ভক্তিপূর্ণ কোন কর্মে হঠাৎ করেই কেন জানি ম্যানগানের বোনের নামটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতো আমি তা আদৌ বলতে পারবোনা আমার দুচোখ সর্বদা অশ্রুপূর্ণ থাকতো (কেন তা থাকতো আমি তা বলতে পারবোনা) আর একই সময়ে কিসের আবেগধারা যেন আমার হৃদয় হতে উপছে বের হতো বক্ষভেদ করে আমি ভবিষ্যতের কথা অল্পই ভাবতাম আমি জানতাম না আমি কখনো তাকে আমার চিরন্তন কথাটি বলতে পারবো কিনা, যদিও বলতে পারি তাহলে আমি আমার অন্তরের এলোমেলো অবস্থার কথা বলতে পারবো কিনা সন্দেহ আমার পুরো শরীরটা ছিল বাদ্যযন্ত্রের মতো তার শব্দাবলী আর চলনবলন আমার বীণা তারে যেন অঙ্গুলি চালনা করে যেতো
একদিন সন্ধ্যে বেলায় আমি পেছনের বৈঠকখানা ঘরে চলে এলাম, যেখানে ভাড়াটিয়া যাজক মারা গিয়েছিলেন এটা ছিল বৃষ্টিমুখর একটি সন্ধ্যা, গৃহে কোন রকম সাড়া শব্দ ছিলনা আমি শুনছি অবিরল বৃষ্টির আছড়ে পড়ছে আধা সিক্ত ঘামাচ্ছাদিত মৃত্তিকায় সূচের মতো একটু দূরের বাতিগুলো আর জানালার মৃদু আলো আবছা দেখাচ্ছিল আমি ধন্য, এর অল্প কিছুই আমি দেখতে পাচ্ছিলাম আমার একান্ত ইচ্ছের কাছে এইসব দৃশ্যাবলী একেবারে ঢাকা পড়ে যেতো, আমি দ্রুত পিছলে বের হয়ে যেতাম এসব থেকে আমার দয়িতার উদ্দেশ্যে আমি আমার দুহাতের পাতা একত্র করে কচলাতে কচলাতে বিড়বিড় করে অনেকক্ষন ধরে উচ্চারণ করতাম, প্রেম! আমার ভালোবাসা!
অবশেষে সে আমার সাথে কথা বললো যখন সে আমাকে উদ্দেশ্য করে তার প্রথম বাক্যটি উচ্চারণ করলো, আমি ভেবে পেলাম না এর কি উত্তর দেবো সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি আরাবিতে গিয়েছিলাম কিনা আমি গিয়েছিলাম কিনা মনে নেই, আমি হা না গোছের একটা জবাব দিলাম আরাবি ছিল একটা বর্ণিল বাজার বললো, সেখানে সে খুশি মনে যেতে আগ্রহী
তবে যাওনা কেন, জিজ্ঞেস করলাম আমি তার কবজিতে জড়ানো রূপোর ব্রেসলেটটা ঘোরাতে ঘোরাতে কারণ হিসেবে সে বললোঃ গীর্জায় উপস্থিত থাকতে হবে আর সপ্তাহে গীর্জায় প্রার্থনা সভার জমায়েতে যোগ দিতে হবে ওর ভাই আর দুটি বালক তাদের ক্যাপ নিয়ে টানা হেচড়া করছিল আর আমি একাকী দাঁড়িয়ে ছিলাম রেলিং ধরে অপর পাশে আমাদের গৃহের দরজার ফোকর গলে বাতির আলো ঠিকরে পড়ে ওর কণ্ঠদেশ বেষ্টন করে বৃত্ত তৈরী করছিল, কেশ গুচ্ছ তার অলস ভাবে বিশ্রাম নিচ্ছিল আবার এলিয়ে পড়ছিল হাত দুটো ওর আলতো করে বিশ্রামের ভঙ্গিতে রাখা ছিল রেলিংএ একপাশে ঝুলে পড়া ঘাঘড়ার সাদা কিনারা ধরে রেখেছিল
এটা তোমার জন্য ভালো হবে, বলল সে
যদি আমি মেলাতে যাই, তাহলে তোমার জন্য অবশ্যই কিছু আনবো? আমি বললাম
কি বোকামীই না আমি করেছি, প্রতিদিনের জাগরণে আর নিদ্রায়, সেদিন সন্ধ্যের পর থেকে সব কিছু ঝেঁটিয়ে দূর করলাম মন থেকে, সেদিন সন্ধ্যের পর হতে ভাবলাম আমার সব ক্লান্তিকর দিক গুলো একেবারে ধ্বংস করে দেবো বিদ্যালয়ের কাজগুলো আমার কাছে জ্বালাতন বলে মনে হলো দিনের বেলায় আমার শ্রেণী কক্ষে আর রাতের বেলায় আমার শয়ন কক্ষে শুধু তারই মুখ আমার ভেতরে আসা যাওয়া করতে লাগলো পড়াশুনার ব্যাপারটাও ক্লান্তিকর মনে হতে থাকলো আরাবি নামের অক্ষর কটি আমার নীরব অন্তঃকরণকে বিলাস বৈভবে আহ্বান জানালো আর প্রাচ্যদেশীয় সন্মোহনী যেন আমার মাঝে ভর করলো আমি জিজ্ঞেস করলাম শনিবার রাতে আমাকে বাজারে যেতে হবে কিনা আমার চাচী অবাক হলেন আর আশা করলেন যে এটি গোপন ভ্রাতৃসংঘে যোগ দেয়ার কোন উদ্দেশ্য নয় আমি আমার ক্লাশে পাঠের খুব কমসংখ্যক উত্তর প্রদান করলাম আমি লক্ষ্য করলাম আমার শিক্ষকের মমত্ববোধ নয় কাঠিন্যতার ছায়া পড়েছে আমি আশা করেছিলেম শুরুতেই আমি ততোটা অলসতা প্রদর্শন করবো না আমি আমার জীবনের গুরুতুপূর্ণ কাজ গুলো খুবই ধৈর্য সহকারে সমাধা করার চেষ্টা করতাম কিন্তু বর্তমানে আমার এবং আমার ইচ্ছের মাঝে ম্যানগানের বোনের বিষয়টি প্রবেশ করে সকল কর্মকান্ডগুলো আমার ছেলেমীর পর্যায়ে এনে ফেলেছে, ছেলেখেলার পর্যায়ে চলে গেছে

শনিবার সকাল বেলাতেই আমি আমার চাচাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, আমি সন্ধ্যেবেলায় মেলাতে যেতে চাই তিনি তখন দেয়াল আলনায় রক্ষিত টুপির স্ট্যান্ডে টুপির ব্রাশ খুঁজতে ব্যস্ত ছিলেন আর সে অবস্থায়ই দায়সারা ভাবে জবাব দিলেন, হ্যা, আমি জানি বাছা

যেহেতু তিনি হল কক্ষে ছিলেন সে জন্যে আমি সামনের বারান্দার জানালার পাশে শুতে গেলাম না, আমি এই হাস্যকর বাড়ীটা হতে বের হলাম আর বিদ্যালয়ের পথে রওয়ানা হলাম বাতাস ততোটা তীব্র শীতল ছিল না কিন্তু আমার হৃদয়টা কেমন যেন বিষণ্ণতায় ভরে গেল আমি যখন দুপুরের খাবার খেতে এলাম, তখন পর্যন্তও আমার চাচা বাসায় ফিরেন নি, অথচ এটা ছিল সকাল বেলার কথা আমি কিছুক্ষণ ঘড়ির পানে তাকিয়ে বসে রইলাম, যখন এর টিক টিক আওয়াজে আমার জ্বালা ধরে গেল তখন আমি কক্ষ ত্যাগ করলাম সিঁড়ি বেয়ে আমি বাড়ীর শেষ তলায় চলে এলাম এই উচ্চতার সাথে শীতলতা, নির্জনতা আর বিষণ্ণ চারপাশ আমাকে যেন মুক্তির স্বাদ দিল, আমি গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে এক রুম হতে অন্য রুমে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম সামনের জানালা পথে নীচে তাকিয়ে দেখলাম আমার বন্ধুরা নিচের রাস্তায় খেলা করছে তাদের তারস্বরে চিৎকার চেচামেচি আমাকে দুর্বল করে দিল আর আলাদা করে ফেলল ওদের থেকে আর আমি আমার কপালটা শীতল জানালার কাঁচে ঠেকালাম ম্যানগানের বোন যে বাড়ীতে থাকে সেই অন্ধকার বাড়ীটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, আমি প্রায় অন্ধকার বাড়ীটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, আমি প্রায় ঘন্টা খানেক এখানে দাঁড়িয়ে রইলাম, বাদামী কর্দম ছারা নির্মিত কল্পিত এক অবয়ব ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না, আর বাতির আলোকশিখা অতি সূক্ষ্ণভাবে তার গন্ডদেশ চিত্রিত করে আছে, রেলিং রাখা হাত, পরণের দীর্ঘ পোশাকের প্রান্ত নীচে লুটোচ্ছে

সিঁড়ি বেয়ে যখন নীচ তলায় নেমে এলাম, তখন দেখতে পেলাম মিসেস মাসারি ফায়ারপ্রেসের সামনে বসে আছেন তিনি বৃদ্ধা, বেশী বক বক করেন, বন্ধকি ব্যবসাকারী একজন বিধবা তিনি আবার বিশেষ ধর্মীয় বিষয় সামনে রেখে স্ট্যাম্পও সংগহ করেন চায়ের টেবিলে তার আষাটে গল্প সহ্য করলাম অনেকক্ষন টেবিলে মিসেস মাসরি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন, তিনি আর বেশী দেরী করতে পারলেন না বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন কিন্তু আটটার বেশী বেজে গেছে, তিনি আর দেরী করতে পারছেন না মোটেই, রাতের এই হাওয়াটা তার শরীরের জন্য খুবই খারাপ আমি বার বার উপর নীচ করতে করতে নিজেই নিজের হাতে ঘুষি মারতে থাকলাম, আমার চাচী বললেন, আমি ভয় পাচ্ছি এই ভেবে যে, তুমি আমাদের এই বিশেষ প্রার্থনার রাতে বাজারে যাচ্ছো রাত তখন টা দরজার নক শুনতে পেলাম আমার চাচার আমি শুনলাম তিনি নিজের মনেই কথা বলতে বলতে তার ওভারকোটটা দেয়ালে রক্ষিত আলনায় রাখলেন, আমি বুঝলাম চাচা খোশ মেজাজেই আছেন আমি তাকে আমার বাজারে যাওয়ার ব্যাপারে টাকা দেয়ার কথা বললাম তিনি আসলে তা ভুলে গিয়েছিলেন

তিনি বললেন মানুষেরা এখন তো তাদের বিছানায় এক ঘুম দিয়ে উঠল আমি হাসলাম না আমার চাচী চাচাকে তাড়া দিয়ে বললেনঃ তুমি ওকে টাকা প্রদান করে চলে যেতে দাওনা কেন, এমনিতেই ওকে যথেষ্ট দেরী করিয়ে দিয়েছো

আমার চাচা বললেন, ভুলে যাওয়ার জন্য আমি খুবই দুঃখিত, তিনি বললেন তিনি পুরনো কিছু প্রবাদে বিশ্বাস করেন আর তা হলো একজন বালক খেলবে আর কর্মও করবে, আর যদি সে শুধু কাজই করে না খেলে তাহলে সে জড় আর নিস্প্রাণ হয়ে যাবে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোথায় যাচ্ছি, আর যখন দ্বিতীয় বার আমি তাকে তা জানালাম, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি এটি জানি কিনাদ্য আ্যারাব' ফেয়ারওয়েল টু হিজ স্ট্রীড' যখন আমি রান্নাঘর ত্যাগ করলাম তখন তিনি এই কবিতার শুরুর লাইনটি আমার চাচীর সামনে পরিবেশন করছেন

আমি টাকা কটি মুঠোয় শক্ত করে ধরে লম্বা লম্বা পদক্ষেপে বাকিংহাম স্ট্রীট ধরে সোজা স্টেশন অভিমুখে চললাম পুরো রাস্তা লোকারণ্য, ক্রেতা আর গ্যাসের আলোকোজ্জল বাতি আমার ভ্রমনের উদ্দেশ্যটি ফের স্মরণ করিয়ে দিল আমি ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীর একটি কামরায় উঠে বসলাম অসহনীয় ছিল ট্রেনের বিলম্ব করার বিষয়টি, বিলম্ব শেষে ট্রেনটি ধীর গতিতে যাত্রা করল ট্রেনটি ক্ষয়ে যাওয়া পুরনো বাড়ীঘর আর ঢেউ ঝিলমিল নদীর ধার ঘেষে চলতে লাগল ওয়েস্টল্যান্ড স্টেশনে ট্রেন থামতেই জনতার ভীড় জোর করে তাদের মালামাল তোলার চেষ্টা করল, কিন্তু পোটরি তাদের ঠেলে সরিয়ে দিয়ে জানাল, এটা শুধু মেলাতে যাওয়ার জন্য স্পেশাল ট্রেন আমি ট্রেনে বড়োই একাকী বোধ করতে লাগলাম কয়েক মিনিট পরেই ট্রেনটি একটি অস্থায়ী একটি কাঠের প্লাটফর্মে এসে দাড়ালো আমি দ্রুত রাস্তায় বের হয়ে ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দশটা বেজে দশ মিনিট আমার সামনেই বিশাল একটা দালান তার সামনে যাদুবিদ্যার মতো জ্বলজ্বল করছে আরাবি নামটি

আমি ছয় পেনি প্রদান করে প্রবেশ করার কোন প্রবেশ পথ খুঁজে পেলাম না, সভয়ে লক্ষ্য করলাম মেলা এক্ষুনি বন্ধ হয়ে যাবে আমি দ্রুত পাহারাদার লোকটির হাতে একটা শিলিং প্রদান করে দরোজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম আমি নিজেকে একটা হল ঘরের মাঝে নিয়ে এলাম, দেখলাম হলটিকে এর চেয়ে কিছু কম উচ্চতার বাউন্ডারী দ্বারা ঘিরে রাখা হয়েছে মেলার অধিকাংশ স্টল গুলোই বন্ধ, হল ঘরের বেশীর ভাগটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন আমি অনুভব করলাম উপাসনালয়ের প্রার্থনা শেষে যেমন নীরবতা বিরাজ করে তেমন নীরবতা চারপাশে আমি ভীরু পদক্ষেপে মেলার মধ্যখানে হাটতে লাগলাম অনেক গুলো লোক জড়ো হয়েছে তখনও খোলা এমন একটি স্টলে একটি পর্দা ঝোলানো সামনে, রঙিন বাতির আলোক ফেলে লেখা, “কাফে চ্যান্টটান্টদুটো লোক একটি ট্রেতে পয়সা গুনছে, আমি ধাতব মুদ্রার পতনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি

খুবই কষ্ট করে স্মরণ করতে হচ্ছে আমি কেন এখানে এসেছি এটা ছেড়ে আমি অন্য একটি স্টলে গিয়ে পোর্সেলিনের একটি ফুলের টব এবং ফুল লতা পাতা অংকিত একটি টি সেট মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম স্টলের দরজার একজন যুবতী দুটো যুবার সাথে কথা বলছিল আর হাসছিল আমি তাদের কথা বার্তা অস্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম

, আমি কখনোই এটা সম্পর্কে বলিনি!
ওহ, কিন্তু তুমি এটাই বলেছো
ওহ্‌, আমি তা বলিনি
সে কি তা বলেনি?
হ্যা, আমি যুবতীর কথা শুনেছি
তাহলে এটা.................. Fib!

আমাকে লক্ষ্য করে যুবতী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল আমি কোন কিছু ক্রয় করতে চাই কিনা তার গলার স্বরটি মোটেই আগ্রহ সঞ্চারকারী ছিলনা সে আমাকে দায়সারা ভাবে জিজ্ঞেস করলো, মোট কথা এমনভাবে যেন তা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না আমি পূর্বপাশে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা একটা বিশাল পাত্রের দিকে তাকালাম, দেখলাম অপর পাশটা তার গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা, বিড় বিড় করে বললামঃ না, অনেক ধন্যবাদ
যুবতী ফুলের টব হতে সরে গিয়ে আবার দু যুবার সাথে খোশগল্পে রত হল তারা ফের একই বিষয় নিয়ে আলাপ চালাতে লাগল একবার কি দুবার যুবতী ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকাল
আমি কিছুক্ষণ যুবতীর স্টলের সামনে অপেক্ষা করার পর ভাবলাম এখানে আমার দাঁড়িয়ে থাকাটা একেবারেই অর্থহীন তার স্টলের বস্তুটির প্রতিই ছিল আমার প্রধান, আকর্ষণ আমি দ্রুত পাশ ফিরে ধীর পায়ে মেলার মাঝখানে চলে এলাম আমি দুটো পেনি ফেলে দেয়ার বিপরীতে ছয় পেনি. পকেটে থাকাটা গ্রহণযোগ্য বলে মানলাম আমি গ্যালারীগুলোর বাতি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা শুনতে পেলাম হলের উপরের অংশটা তখন পুরোপুরিই অন্ধকার উপরের অন্ধকারের পানে তাকিয়ে আমার নিজেকে চলিষ্ণু এক হাস্যকর জীব বলে মনে হলো আর চোখ দুটো অসহ্য যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে লাগলো।

No comments:

Post a Comment

Blog Archive