Sunday, February 14, 2016

গ্রীসের মজার ও শিক্ষামুলক গল্পঃ উইল

  
একদল লোকের চেয়ে একজন বুদ্ধিমান লোকের মুল্য অনেক বেশি। সেই কথাটা জানানোর জন্যই এই গল্পএকবার একজন ধনী লোক তাঁর তিনটি মেয়ে রেখে মৃত্যু বরন করলেন। তাদের মধ্যে একটিব মেয়ে ছিলো চালচলনে বেপরোয়া স্বভাবের,  তবে সুন্দরী। সে তার দৃস্টি দিয়েই  অনেক পুরুষকেই ঘায়েল করে থাকে। দ্বিতীয় মেয়েটি ছিলো খুবই  হিসাবি এবং চরকায় উল বুনতে জানে। তৃতীয়টি মেয়েটি ছিল কুশ্রি। একটি মদের পিপের মত মোটা আর সারাক্ষন মদ পান করতো।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে তার সম্পদের ট্রাস্টি নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। তাতে নির্দেশ দেওয়া ছিলো, তাঁর সম্পত্তি এমন সমানভাবে মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে  হবে, যাতে করে তারা তাদের ভাগের সম্পত্তি কোন ভাবেই নষ্ট না করতে পারে। আর ২য়  শর্ত হল,  যদি মেয়েরা সম্পত্তি না রাখতে চায়, তবে তারা প্রত্যেকে তাদের মাকে এক  হাজার ব্রোঞ্জ মুদ্রা দেবে।এই উইলের খবরটা পুরো এথেন্সে ছড়িয়ে পড়ল। মা তো মহা  মুশকিলে পড়লেন। আইনজীবীদের বাড়িতে ঘুরতে লাগলেন তাঁর স্বামীর উইলের বিষটি বোঝার জন্য। কিন্তু কেউ কোনো সমাধান দিতে পারলেন না। সত্যিই তো, মেয়েরা যদি সম্পত্তি না চায় বা সেই সম্পত্তি ভোগ না করতে পারে, সে ক্ষেত্রে এমন কোনো নগদ টাকার ব্যবস্থা তো নেই, যা দিয়ে তারা মায়ের প্রাপ্য মিটিয়ে দিতে পারবে।অনেক দিন অনেক রকম চিন্তাভাবনা করেও যখন ওই উইলের মর্মার্থ বের করতে পারলেন না, তখন মা ঠিক করলেন, তাঁর ইচ্ছামতোই এই সম্পত্তি মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দেবেন। তিনি সম্পত্তির হিসাব করতে বসলেন।মা তাঁর বেপরোয়া সুন্দরী মেয়েটাকে দিলেন ভালো ভালো পোশাক, দামি অলংকার আর সেই সঙ্গে কাজের জন্য বালক ভৃত্যদের।তাঁর পরিশ্রমী আর হিসাবি মেয়েটিকে দিলেন জমিজমা, গরু-ভেড়া, খামার বাড়িটা, লাঙল-বলদ, চাষের যন্ত্রপাতি, চাষি ইত্যাদি।আর মাতাল ও কুশ্রি মেয়টিকে দিলেন মদের ভাঁড়ার, পিপে ভর্তি আঙুরের মদ, একখানা বড় বাড়ি আংগুরের বাগানসহ।মা যখন আত্মীয়স্বজন  ও পারা-প্রতিবেশীদের মতামত নিয়ে এভাবে মেয়েদের স্বভাব অনুযায়ী সম্পত্তি ভাগ করে দেবেন ঠিক করললেন, সে সময় সেই লোকজনের মধ্যে দেখা গেল ঈশপকে।ঈশপ সব শুনে বললেন, এ কী করছ তোমরা? ভদ্রলোকের উইলের মর্ম তোমরা কেউ বুঝতে পারনি। হয়তো ভদ্রলোক এই কাণ্ড দেখে তাঁর কবরের মধ্যে খুব দুঃখ প্রকাশ করছেন।’‘তাহলে কী করবো? সবারই প্রশ্ন। সবাই অবাক।এ তো অতি  সহজ। ঈশপ বললেন, আংগুর বাগান সহ ওই বড় বাড়িখানা, মদের ভাঁড়ার ওই হিসাবি পরিশ্রমী মেয়েটিকে দেওয়া হোক। সাজ-পোশাক, হীরা-মুক্তা-অলংকার, দাসদাসী সব দেওয়া হোক দেখতে ভালো না মাতাল মেয়েটিকে। আর জমিজমা, পশুর পাল, লাঙল ইত্যাদি দেওয়া হোক ওই সুন্দরী মেয়েটিকে। তাহলে এতে তিন মেয়ে তাদের স্বভাব অনুযায়ী ওই রকম সম্পত্তি পাওয়া পছন্দ করবে না। দেখতে ভালো নয় মাতাল মেয়েটি সাজপোশাক সব বিক্রি করে দেবে মদ কেনার জন্য। সুন্দরী মেয়েটি জমিজমা বিক্রি করবে সাজপোশাকের জন্য। আর হিসাবি খাটিয়ে মেয়েটি বড় বাড়ি, বাগান সব বিক্রি করে চাষবাসের জমি কিনবে।অতএব, যে মেয়ে যা পেয়েছিল কিছুই রাখবে না। যার যার জিনিস বিক্রি করে নগদ টাকা জোগাড় করবে, আর তা থেকে তাদের মাকে তাঁর প্রাপ্য টাকা মিটিয়ে দেবে।সারমর্ম:বুদ্ধিমানই সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

কোরিয়ার রুপকথাঃ ছোট্ট তুষারমানব




শীত এসেছে। আবহাওয়া অনেক ঠাণ্ডা। স্বচ্ছ স্ফটিকের মত সাদা তুষার দেখতে খুবই ভালো লাগছে বাচ্চা খরগোশের কাছে। বাচ্চা খরগোশ জন্মেছিল এই গ্রীষ্মে। তাই সে সময় তুষার দেখেনি সে।আম্মু, তুষার কী?, বাচ্চা খরগোশ তার মাকে জিজ্ঞেস করল।মা খরগোশ বললেন, তুষার এক রকমের ফুল যা ঐ নীল আকাশে ফোটে।তুমি কাছে থেকে দেখলে বুঝবে তুষার ছয়টি পল্লব দিয়ে গঠিত।মা খরগোশ বললেন, কী সুন্দর তুষার! তাই না ? চলো আমরা তুষারমানব বানাই।মা খরগোশ বাসায় গিয়ে বালতি,  শাবল আর অন্যান্য জিনিস আনলেন। তারপর বাচ্চা খরগোশকে নিয়ে তুষারমানব বানাতে লেগে গেলেন।বাচ্চা খরগোশ শুধু তার মা খরগোশকে উপর নিচে দৌড়ে দৌড়ে তুষার এনে দিতে লাগল। কারণ সে জানত না যে আসলে তুষারমানব কী জিনিস। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাচ্চার মতো দেখতে একটি তুষারমানব হয়ে গেল। বাচ্চা খরগোশ খুশিতে তুষারমানবের চারপাশে নাচতে লাগল। হঠাৎ করে বাচ্চা খরগোশ খেয়াল করল, তুষারমানবের কোন চোখ ও নাক নেই।মা খরগোশ বললেন,ঠিক আছে, কয়লা দিয়ে চোখ আর গাজর দিয়ে নাক বানিয়ে দিচ্ছি।বাচ্চা খরগোশ সাথে সাথে বাসা থেকে দুই টুকরো কয়লা এবং এক টুকরো গাজর  এনে দিলো। একটি সুন্দর তুষারমানব হয়ে গেল।মা খরগোশ বাচ্চা খরগোশকে তুষার মানবের নাম দিতে বললেন। বাচ্চা খরগোশ তার নাম দিল ছোট্ট তুষার মানব।বাচ্চা খরগোশের দেয়া নামটি মা খরগোশের  খুব পছন্দ হল। তিনি বালতি দিয়ে ছোট্ট তুষার মানবের মাথায় একটি টুপি পরিয়ে দিলেন। প্রতিদিন বাচ্চা খরগোশ বাইরে তাকালেই তুষারমানবকে দেখতে পেত। সে মাকে জিজ্ঞেস করত, তুষারমানবের ঠাণ্ডা লাগে না???।মা খরগোশ বললেন, তুষারমানবের ঠাণ্ডা লাগে না। বরং তুমি  তাকে ভিতরে আনলে ও সাথে সাথে গলে যাবে।একদিন মা খরগোশ কাজে বাইরে গেলেন। কিছুক্ষণ পর বাচ্চা খরগোশের একা একা লাগতে লাগল। সে বাইরে গিয়ে তুষারমানবকে বলল, তুমি কি আমার সাথে খেলবে, ছোট্ট তুষার মানব?তুষারমানব সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। সে বলল, হ্যাঁ অবশ্যই! দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেছি। খেলার জন্য আমিও কাউকে খুঁজছিলাম।এরপর তারা দুজনে তুষারের উপর দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করল। লুকোচুরি খেলল। খেলতে খেলতে তারা পাশের পাহাড়ি জংগলে দিকে চলে যাচ্ছিল।পাহাড়ের একদিক থেকে বাচ্চা খরগোশ বলছে, আমি বাচ্চা খরগোশ।অপর দিক থেকে তুষারমানব বলছে, আমি তুষারমানব।পরে তারা একে অপরকে খুঁজে পেয়ে দুজনে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। এই খেলায় তারা দুজনেই খুব মজা পেল।একে অপরকে চিৎকার করে বলতে লাগল আমরা ভালো বন্ধু! আমরা ভালো বন্ধু!খেলা শেষে একসময় ছোট্ট খরগোশ বাড়িতে চলে গেল। আগের মতই তুষারমানব বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। ওদিকে বাচ্চা খরগোশ ঘরে ঢুকে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল।কিছুক্ষণ পরে ঘর গরম রাখার জায়গা থেকে কাঠের মাধ্যমে আগুন লেগে গেল। আস্তে আস্তে আগুন সারা ঘরে ছড়াতে লাগল। বাচ্চা খরগোশ আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করল। কিন্তু ঘন ধোঁয়ার কারণে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না সে। এক সময় বাচ্চা খরগোশ জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।তুষারমানব ঠিকই বাইরে থেকে আগুন দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু আগুনের কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। কারণ আগুনের তাপে সে মুহূর্তের মধ্যে গলে যাবে। আগুন ক্রমশ বড় হতে লাগল। পুরো ঘর একসময় পুড়ে যাওয়ার উপক্রম হল। শেষ পর্যন্ত তুষারমানব তার বন্ধু বাচ্চা খরগোশকে বাঁচানোর প্রতিজ্ঞা করল। এমনকি যদি তাতে তার জীবন চলে যায় যাক। তুষারমানব দৌড়ে ঘরে ঢুকলো। সে বাচ্চা খরগোশকে কোলে করে ঘরের বাইরে নিতে চেষ্টা করল। ইতিমধ্যে ঘর ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। আর এদিকে তুষারমানব গলতে শুরু করল। তুষারমানবের শরীর থেকে টপ টপ করে গলানো পানি বাচ্চা খরগোশের মুখে পরতে লাগল। তুষারমানব পড়ন্ত দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে কোনরকমে জ্বলন্ত ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারল। কিন্তু তার শরীর এতটাই ছোট হয়ে গেল যে তার বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পরই তুষারমানব পুরোপুরি গলে গিয়ে বাচ্চা খরগোশের পাশে জমানো পানি হয়ে পড়ে থাকল। মা খরগোশ দূর থেকেই তার ঘরে আগুনের শিখা দেখতে পেলেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি দ্রুত বাড়ির দিকে এগোলেন। বাড়িতে পৌঁছে দেখলেন পুরো ঘর পুড়ে ছাই। আর বাচ্চা খরগোশ টি তুষারের উপর পড়ে আছে। মা খরগোশ তখনই বাচ্চা খরগোশকে ডেকে তুললেন। চোখ মেলে বাচ্চা খরগোশ সাথে সাথে মা খরগোশের বুকে আশ্রয় নিল। 
"তুমি বেরিয়ে এলে কিভাবে? " মা খরগোস জিজ্ঞাসা করল। 
বাচ্চা খরগোশ বলল, ছোট্ট তুষারমানব।
তখন মা খরগোশ জানতে চাইলেন, তুষারমানব টি কোথায় ?
বাচ্চা খরগোশ কিছুই বলতে পারল না। শুধু চোখে কান্নার পানি নিয়ে পাশে পরে থাকা চকচকে পানির দিকে তাকিয়ে থাকল। পানির ভিতর দেখা যাচ্ছে দু'টুকরো কয়লা, একটি গাজরের টুকরো আর একটি বালতি। এগুলো দেখে মা খরগোশ বুঝতে পারলো কী ঘটেছে। মা খরগোশ বাচ্চা খরগোশকে বললেন, তুমি মন খারাপ করো না।সামনে যখন শীত আসবে তখন আমরা আবার ছোট্ট তুষারমানব বানাব।” বাচ্চা খরগোশ কিছু না বলে পরিষ্কার নীল আকাশের দিকে তাকাল। সেখানে সে যেন দেখতে পেল ছোট্ট তুষার মানব তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

Friday, February 12, 2016

হাসির গল্পঃ বোকা ভূত


 হাসির গল্পঃ বোকা ভূত

একদিন এক বোকা ভূত শেওড়া গাছের ডালে বসে ছিল,  এক দুষ্টু ছেলে শেওড়া গাছের নিচে যাচ্ছিল। ভূত তো ভাবল এইতো সুযোগ।   লাফ দিয়ে সামনে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।

চকচকে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলল, এখন তোর ঘাড় মটকাব।কিন্তু দুষ্ট ছেলেটা বলল, তুই আমার কি ঘাড় মটকাবিরে? জানিস আমি কে?  বোকা ভুত বললকে তুই?”“আমি হলাম ভূতের বাপ টুত।”“তাই নাকি? তুই টুত। তোর কী আছে যে,  তুই আমাকে ভয় দেখাস?  দুস্টু ছেলেটা বললকারণ আমি যা খেতে পারি তা তুই খেতে পারবি না। তাই নাকি, দেখা তো?
দুষ্ট ছেলেটা তার পোটলা থেকে দুটো ক্ষুদ্র মাটির পাতিল বের করল। এক পাতিলে ছিল দই, আর এক পাতিলে সাদা চুন। দুষ্ট ছেলেটা দইয়ের পাতিল থেকে এক চামচ দই খেল। আর চুনের পাতিলটা বোকা ভূতের হাতে দিয়ে বলল, এইবার নে,  তুই খা দেখি।বোকা ভূত তো আর এত কিছু বোঝেনি। সে যেই এক চামচ মুখে দিয়েছে অমনি ওরে বাবা গো ওরে মা গো, বাঁচাও গো বলে চিৎকার করে হাত থেকে সব ফেলে দিল আর  দুষ্ট ছেলেটার পায়ে পড়ে গেল। এবার ছেলেটা জোরে অট্টহাসি দিয়ে বলল, হীরা জহরত যা আছে এখুনি বের কর।


অনুবাদ গল্পঃ বন্ধুত্ব পরখ


সে অনেক অনেক কাল আগের কথা।কোন এক গ্রামে বাস করতো দুই বন্ধু। একজন ওয়ালিদ, অন্যজন ওয়াফী। মুখোমুখি ঘর দুজনের।গ্রামের সবাই তাদের বন্ধুত্বের কথা জানতো । আর এক বুড়ো ছিল। সে অনেক জ্ঞানী ছিল। একবার সে  ওয়ালীদ আর ওয়াফিয়ের বন্ধুত্ব পরখ করে দেখতে চাইলেন ।দুই বাড়ির মাঝে ছিলো পায়ে হাঁটা এক পথ। এক সকালে ওই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন বুড়ো। মাথায় একটা নতুন টুপি। টুপিটার একপাশ লাল, অন্যপাশ সবুজ।প্রথমেই দেখা হলো ওআলীদের সঙ্গে। নিজেদের জমিতে লতানো গাছের পরিচর্যা করছিলো সে।বুড়ো বললেন, শুভ সকাল, ওয়ালীদ।ওয়াফী বললো, শুভ সকাল। খুব সুন্দর লালটুপি পরেছেন দেখছি।বুড়ো বললেন, ধন্যবাদ। টুপিটা সুন্দর হয়েছে জেনে খুশি হলাম।" ওয়াফী বললো, সত্যিই খুব সুন্দর টুপিটা।টুপিটা নেড়েচেড়ে একটু ঠিকঠাক করে আবার হাটতে শুরু করলো বুড়ো। কিছুক্ষণ পর দেখা হয়ে গেলো ওয়ালিদের সঙ্গে। ওয়ালীদ তখন জমির আগাছা পরিষ্কার করছিলো।বুড়ো লোকটি তখন হাঁক দিলেন, শুভ সকাল, ওয়ালীদ'। ওয়ালীদ ঘুরে তাকালো জ্ঞানী বুড়োর দিকে। নতুন টুপিটা তারও চোখ এড়ায়নি। বললো, ওহ্! কী সুন্দর সবুজ রঙের টুপি পরেছেন। নতুন ?মুচকি হেসে বুড়ো বললেন, এই আর কি। এমন একটা টুপির শখ অনেকদিন থেকেই ছিলো। সে যাই হোক। তারপর বলো, কেমন আছো তুমি?ওয়ালীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে গেলেন বুড়ো।একসময় সূর্যটা চলে এলো একেবারে মাথার ওপর। দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে। কাজ বন্ধ করে ওয়ালীদ গেল তার বন্ধু ওয়াফীর কাছে। প্রতিদিন দুজন একসঙ্গে দুপুরের খাবার খায়। খেতে খেতেই ওয়াফী জানতে চাইলো, আমাদের প্রতিবেশী বুড়োর নতুন লাল টুপিটা দেখেছো? খুব সুন্দর, তাই না?অবাক হয়ে ওয়ালীদ বললো, লাল! তুমি লাল কই দেখলে, সবুজ টুপিটাকে তুমি লাল কেন বলছো? টুপিটা তোমার কাছে হয়তো লাল মনে হয়েছে। আসলে সূর্যের ঝকমকে আলো তোমার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিয়েছে।ওয়াফী বললো, মানে! তুমি কী বলতে চাইছো?বন্ধুর বোকামীতে একটা ব্যঙ্গ হাসি দিলো ওয়ালীদ, আর বললো, আমাদের প্রতিবেশী বুড়োর মাথায় লাল টুপি দেখিনি বন্ধু। সবুজ টুপি দেখেছি।ওয়াফী বললো, সবুজ টুপি! ওহ্, বন্ধু আমার, উল্টাপাল্টা কী বলছো বুঝতে পারছি না! ওটা সবুজ টুপি ছিলো না। লালই ছিলো। আমি ভালোমতো দেখেছি।গলা চড়িয়ে ওলেলে বললো, উঁহু। আমিই ঠিক বলছি। ওটা সবুজ ছিলো।বন্ধুর চড়া গলা শুনে বিরক্ত হলো ওয়াফী। গলা চড়ালো সে-ও, আমিই ঠিক দেখেছি। টুপিটা লালই ছিলোএবার রেগে গেলো ওয়ালীদ ও।


চেঁচিয়ে উঠলো, টুপিটা সবুজই ছিলো।তারপর টুপির রঙ নিয়ে শুরু হলো দুজনের মধ্যে চিৎকার আর চেঁচামেচি। খানিকপর ঝগড়া। আরও খানিকপর বিষয়টা আর ঝগড়াতেই আটকে রইলো না, হাতাহাতিতে গিয়ে ঠেকলো। ওদের হাতাহাতি আর চিৎকার শুনে জড়ো হতে লাগলো অন্য প্রতিবেশীরা। একটু পর ওদের প্রতিবেশী সেই বুড়ো ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন দুজনের কাছে। জানতে চাইলেন, কী হচ্ছে এসব? দুই বন্ধু মারামারি করছো? অথচ আমি তো ভেবেছিলাম তোমরা খুব ভালো বন্ধু। তোমাদের বন্ধুত্বের নমুনা এই? ছিঃ ছিঃ ছিঃ!মাঝপথে বাধা পেয়ে থেমে গেলো ওয়ালীদ  আর ওয়াফী। চোখ বড় বড় করে তাকালো বুড়োর দিকে। ঠিক তখনই টুপিটার সবুজ দিকটা ওয়াফীর আর লাল দিকটা ওয়ালীদের চোখে পড়লো।সঙ্গে সঙ্গে ওয়ালীদ বললো, বন্ধু ওয়াফী, আমি আসলেই দুঃখিত। তুমি ঠিক কথাই বলেছিলে তখন। আমাদের প্রতিবেশীর টুপিটা সত্যিই লাল।সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলো ওয়াফী, না, না, তুমি ভুল বলোনি। না জেনে ভুল কথা আমিই বলেছিলাম। সূর্যের চিকচিকে আলোয় আমার চোখে তখন ধাঁধা লেগেছিলো। সে জন্যই আমাদের প্রতিবেশীর সবুজ টুপিটাকে লাল দেখেছিলাম।ওয়ালীদ বললো, উঁহু। তুমিই ঠিক বলেছিলে। টুপিটা আসলেই লাল।ওয়াফী বললো, না। তুমিই ঠিক বলেছিলে, সত্যি সত্যি টুপিটা সবুজ।তারপর আবার শুরু হলো দুজনের চেঁচামেচি, হৈচৈ, ঝগড়া। দুজনের ঝগড়া দেখে না হেসে পারলেন না বুড়ো। হাসতে হাসতেই মাথা থেকে টুপিটা খুলে দেখালেন, দেখোতো এটা। টুপির ব্যাপারে কারোরই ভুল ছিলো না। কিন্তু বন্ধুত্বের ব্যাপারে তোমরা কেউই ঠিক নও। আসলে এখনও তোমরা কেউ কারও সেরা বন্ধু হতে পারোনি। টুপির রঙ নিয়ে দুজনই হৈচৈ করেছো, চেঁচামেচি করেছো, রাগারাগি করেছো, এমনকি মারামারিও করেছো। তোমরা কেউই ঠাণ্ডা মাথায় যাচাই করে দেখোনি, কার কথাটা ঠিক। নিজের দেখাটাকেই সঠিক হিসেবে চাপিয়ে দিতে চেয়েছো। টুপি, টুপির রঙ এসব কিছুই তোমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। গুরুত্বপূর্ণ ছিলো নিজের কথা।ওয়ালিদ বললো, আপনি ঠিকই বলেছেন। আসলে যাচাই ছাড়া কেউই বুঝতে পারে না, কার বন্ধুত্ব কতোখানি। টুপিটা লাল নাকি সবুজ, সেটা এখন আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়_ ওয়াফীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কতোখানি_ সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।সঙ্গে সঙ্গে ওয়াফীও সমর্থন জানালো বন্ধু ওয়ালীদের কথায়, আমার কাছেও।এরপর থেকে তাদের বন্ধুত্ব হয়েছে আরও গভীর।

Wednesday, February 10, 2016

বৃদ্ধা ও বাস





বৃদ্ধা ও বাস
এক বৃদ্ধা ময়মনসিংহেরবাসে উঠেছে! বাসে উঠে বসে, হেল্পারকে সে বলল,ভালুকা আসলে আমাকে অবশ্যই মনে করিয়ে  দিয়ো!হেল্পার তাকে আশ্বস্ত করল,ঠিক আছে, ঠিক আছে, নানী,  চিন্তা কইরেন না। বাস চলতে শুরুকরল! বৃদ্ধা তখন দুই মিনিট পরেই হেল্পারকে ডেকে বলল, ভালুকা আসছে?হেল্পার উত্তরে বলল না! কিন্তু বৃদ্ধা  দুই মিনিট পর পরই হেল্পারকে এই একই প্রশ্ন করতে লাগল! হেল্পার ও বাসেরযাত্রীরা বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধকে ধমক দিল!বৃদ্ধা  তখন ভয়ে চুপ। এদিকে বাসচলতে চলতে ভালুকা ছাড়িয়ে সামনে স্টপেজের মাঝামাঝি চলে এল। তখন হেল্পারের মনে পড়ল যে বুড়িমা তো ভালুকার কথা বলে রেখেছিল! বাসের সব যাত্রী তখন হেল্পারকে বকাঝকা করে বাস ঘোরাতে বলল। তো বাস আবার ভালুকায় এল। হেল্পার বুড়িকে বলল, নানী, ভালুকা আসছে!আপনে নামবেন বলেছিলেন! বৃদ্দা তখন চোখ কুঁচকে জবাবদিল, নামবো  কে বলেছে তোমাকে??? ডাক্তার আমাকে ঢাকা থেকে একটা ট্যানলেট খাওয়াইয়া বলেছে ভালুকায় গিয়া আরেকটা খাইতে! আমি এখন ট্যাবলেট খাবো!একটু পানি পানি দাও তো!

গ্রাম বাংলার মজার গল্পঃ আয়না ( পর্ব ৩)


আয়না (পর্ব ১) দেখতে এখানে ক্লিক করুন
  




"ওরে গোলাম, ওরে নফর, তবুও বলিশ তোর বাজান।তোমার বাজানের  গলায় কি হাসলি,  নাকে নথ  আছে নাকি?"বউ আরো জোরে চিতকার করিয়া উঠিলো।
   পাশের বাড়ির  বড় বু বেড়াইতে আসিয়াছিল।মাথায় ঘুমটা দিয়ে এসে বললো, " কিলো, তোদের বাড়ি এত ঝগড়া কিসের?  ---তোদের তো কত মিল ছিলো। একদিন কোন কথা কাটাকাটি শুনি নাই।"
   চাষীর বউ আগাইয়া আসিয়া বলিলো, -" দেখ বুবুজান,  আমার সোয়ামী আর একটি বউ বিবাহ করিয়া আনিয়া কলশির ভিতর লুয়াইয়া রাখিয়াছিল।  ঐ সতিনের মেয়ে সতিন কে আমি পা দিয়ে পিষিয়া ফেলিবো না।? দেখ দেখ,  বুবুজান, ঐ আয়নার ভিতর কে?
 তখন বড় বউ আসিয়া সে আয়নার উপর মুখ দিলো।তখন দুই জনের চেহারা দেখা গেলো।তখন ও বাড়ির বড় বউ বলিল এ তো তোর চেহারা,  আর একজন কারো চেহারাও যেন দেখতে পাইতেছি।
  চাষী বলে,  " কি বলেন বুবু জান, এর ভিতরে আমার বাপজানের চেহারা। "এই বলিয়া চাষী আসিয়া আয়নার সামনে মুখ দিল।তখন তিনজনের চেহারাই দেখা গেল।তাহাদের কলরব শুনিয়া এ বাড়ির ছোট বউ, সে বাড়ির মেঝো বউ,  আরফানের মা, আব্দুর রহমানের বোন,  আনোয়ারার নানী আসিল।

   যে আয়নায় মুখ দেয়, তাহারি চেহারা আয়নায় দেখা যায়------- এ তো বড় তেলেসমাতির কথা।এই খবর,  এ গায়ে সে গায়ে রটিয়া গেল।এদেশ হইতে ও দেশ হইতা লোক ছূটিয়া আসিলো,  সেই যাদুর তেলেসমাতি  দেখিতে।তারপর ধীরে ধীরে লোকে বুঝিতে পারিলো সেটা আয়না।

Tuesday, February 9, 2016

গ্রাম বাংলার হাসির গল্পঃ আয়না (পর্ব ২)


  চাষী খেত কামারের কাজে মাঠে গিয়েছে।চাষীর বউ গোপনে গোপনে পানির কলসি হইতে আয়না খানা বাহির করিয়া, তাহার দিকে চাহিয়া রাগে আগুন হইয়া উঠিলো।
  আয়নার উপরে তাহার নিজেরই ছায়া পড়িয়াছিলো; কিন্তু সে তো কোনদিন নিজের চেহারা আয়নায় দেখে নাই।সে মনে করিল,  তাহার সোয়ামী আরেকটি মেয়ে মেয়ে বিয়ে করিয়া এই পানির কলসির ভিতর লুকাইয়া রাখিয়াছে। সেই জন্যে আজ কয় দিন তার স্বামী তার সাথে কথা বলিতেছে না।
   যখনি অবসর পায়, ঐ মেয়েটির সাথে কথা বলে।"আসুক আগে মিনসে আজ বাড়িতে।আজ দেখাইবো এর মজা।  

একটি ঝাটা হাতে লইয়া বউ রাগে ফুলিতে লাগিলো।আর যে কড়া কথা তাহার সোয়ামীকে শুনাইবে, মনে মনে আউড়াইয়া তাহাতে শান দিতে লাগিলো।দুপুরবেলা মাঠের কাজে হয়রান হইয়া, রোদে  ঘামিয়া, চাষী যখন ঘরে ফিরিলো: চাষীর বউ তখন ঝাটা হাতে লইয়া তাড়িয়া আসিলো,  ওরে গোলাম,  তোর এই কাজ।? একটা কাকে বিবাহ করিয়া আনিয়াছিস।? এই বলিয়া আয়নাখানা চাষীর সামনে ছুড়িয়া মারিলো।"কর কি?  ---- কর কি? ----ও যে আমার বাজান।" অতি আদরের সাথে সে আয়নাখানা কুড়াইয়া লইলো।"দেখাই আগে তোর বাজান।"  এই বলিয়া ঝটকা দিয়া আয়নাখানা টানিয়া লইয়া বলিলো, " দেখ তো মিনসে এর ভেতরে কোন মেয়েলোক বসিয়া আছে?  এ তোর নতুন বউ কিনা?"চাষী বললে,  " তুমি কি পাগল হইলে,  এ যে আমার বাজান! " 
 

গ্রাম বাংলার হাসির গল্পঃ আয়না (পর্ব ১)




এক চাষী খেতে ধান কাটিতে কাটিতে একখানা আয়না কুড়াইয়া পাইলো।তখনও এই দেশে আয়নার প্রচলন হয় নাই।কাহারও বাড়িতে একখানা আয়না কেও দেখে নাই।এক কাবুলিওয়ালা র ঝুড়ি থেকে কি করিয়া একখানা আয়না মাঠের মাঝে পড়িয়া গিয়েছিলো।আয়না খানা পাইয়া চাষী হাতে লইলো।হঠাত তাহার দিকে নজর দিতেই দেখে,  আয়নার ভিতরে একটা মানুষ। আহ-হা এ যে তার বাপজানের চেহারা।বহি দিন আগে তার  বাবা মারা গিয়াছে।আজ বড় হইয়া চাষির নিজের চেহারাটাই তার বাপের  মত হইয়াছে।সব ছেলেই বড় হইয়া কতকটা বাপের মত চেহারা পায়।তাই আয়নার তারা নিজের চেহারা দেখিয়াই চাষী ভাবিল, সে তার বাবাকে দেখিতেছে।তখন আয়নাখানা কপালে তুলিয়া সে সালাম করিল।মুখে লইয়া চুমো দিল। " আহা বাপজান!তুমি আসমান হইতে নামিয়া আমার ধান খেতের মাঝে লুকাইয়া আছো! বাজান --ও বাজান। চাষী এইভাবে কথা কয় আর আয়নার দিকে চায়। চাষী বলে, " আজান!  তুমি তো মরিয়া গেলে। তোমার খেত ভরিয়া আমি সোনাদিঘা ধানা বুনিয়াছি।শাইল ধান বুনিয়াছি।  দেখ দেখ বাজান। কেমন তারা রোদে ঝলমল করিতেছে। তোমার মরার পর বাড়িতে মাত্র একখানা ঘর ছিলো।আমি তিন খানা ঘর তৈরীক করিয়াছি,  বাজান! বাজান,  আমার সোনার বাজান আমার মানিক বাজান।সেদিন চাষী আর কোন কাজই করলো না। আয়ান খানা হাতে লইয়া সব গুলি খেতে ঘুড়িয়া বেড়াইলো।সাঝ হলে বাড়ি আসিয়া,  চিন্তায় পড়ে গেল।  আয়নাখানা কোথায় রাখে এখন?  সে গরিব মানুশ।  তাহার বাড়িতে তো কোন বাক্স নাই। সে পানির কলশির ভিতর আয়ানা খানা লুকিয়া রাখলো।পরদিন চাষী এ কাজ করে,  ও কাজ করে,  দৌড়িয়ে বাড়ি আসে।  এখানে যায়, সেখানে যায় আর দৌড়িয়ে বাড়ি আসে। পানির ভিতর হইতে সেই আয়না খানা বাহির করিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া দেখে,  আর কত রকমের কথা বলে,  বাজান, ----আমার বাজান। তোমাকে  একলা রাখিয়া আমি একাজে যাই,  ও কাজে যাই, তুমি রাগ করিও না।দেখ বাজান, আমরা যদি ভালো ভাবে কাজ না করি,  তবে আমরা খাইবো কি?  চাষার বউ ভাবে এতোদিন আমার সাথে আমার সোয়ামী কত কথা বলিত,  কত হাসি তামাশা করিয়া এটা ওটা চাহিত, কিন্তু আজ কয় দিন আমার সাথে একটাও কথা বলে না। পানির কলসি থেকে কি যেন বাহির করিয়া দেখে আর আবোল তাবোল বকে, ইহার কারন কি?



Monday, February 8, 2016

শিক্ষামুলক গল্পঃ দুস্ট পুরোহিত ও ঈর্শার শাস্তি

  
রাশিয়ার পুরোনো দিনের একটা গল্প শোনাই। অনেক বছর আগে কোন এক গ্রামে এক বুড়ো ও তার স্ত্রী থাকত। তারা অনেক গরীব ছিল। খুব কষ্ঠে তাদের দিন যেত। একদিন বুড়ির কি একটা অসুখ হল। পয়সা নেই তো ডাক্তার দেখাবে কিভাবে? বিনাচিকিৎসায় ধুকে ধুকে বুড়ি মারা গেল। বুড়ো অনেক কান্নাকাটি করল। তারপর তার চিন্তা হল বুড়িকে তো কবরস্থ করাতে হবে; টাকার প্রয়োজন। কি করবে, কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না? সে তার সব বন্ধুদের কাছে সাহায্য চাইল। কবর দেবার জন্য সামান্য কিছু টাকা দরকার। কিন্তু হায়, কেউ তাকে কোন টাকা দিলনা, কারণ সবাই জানে যে তাকে কিছু দিলে সেটা আর ফেরৎ পাওয়া যাবে না।হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত সে গ্রামের পুরোহিতের(খ্রিস্ট ধর্মের ধর্মিয় ব্যাক্তিত্ব) বাড়ি গেল। সকলেই জানত, পুরোহিতটা ছিল খুব শয়তান। তাই বুড়ির শেষ কাজ করানোর জন্য বুড়ো যখন সেই পুরোহিতের কাছে হাত পাতলো কিছু সাহায্যের জন্য, সে স্বভাবমতই বুড়োকে উদ্দেশ্য করে নাক মুখ খিঁচিয়ে বলল, টাকা আছে টাকা? আগে আমার পারিশ্রমিক টা তো দাও, তারপর আমায় ডেকে নিয়ে যেও। টাকা ছাড়া আমি কোন কাজ করিনা জানোনা? বুড়ো কত কাকুতি মিনতি করল, আমার হাতে তো কানাকড়িও নেই পুরুত(পুরহিত) মশাই। তুমি দয়া করে আমার বৌয়ের শেষকৃত্যটা করিয়ে দাও।  তোমার টাকা আমি যেভাবেই হোক, শোধ করে দেব। দুষ্টু পুরোহিতের মন কিছুতেই নরম হল না। তার এক কথা, আগে টাকা তারপর অন্য কাজ।আর কোন উপায় না দেখে বুড়ো মানুষটা শেষ পর্যন্ত ঠিক করল সে নিজেই একটা গর্ত খুঁড়ে তার স্ত্রীকে কবরস্থ করবে। সে কবরখানায় গিয়ে একটা কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে শুরু করল। হঠাৎ কোদালের ঘায়ে খটাং করে একটা শব্দ হল। মনে হল যেন কোদালটা কোন একটা ধাতুর পাত্রে আঘাত করল। সে সাবধানে কোদাল চালাতে লাগল। আরো খানিকক্ষণ খোঁড়ার পর বেরিয়ে এল একটা ঘড়া। সেটা দেখে বুড়ো বেশ অবাক হল, তারপর ঢাকনা তুলে দেখে কি, ভিতরে একরাশ সোনার মোহর ভর্তি! দেখে বুড়োর তো চোখ ঠিক্‌রে যায় আর কি! সে তো জীবনেও এত টাকা দেখেনি।আনন্দে তার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। হাঁটু গেঁড়ে মাটিতে বসে সে ঈশ্বরকে বারবার ধন্যবাদ দিতে লাগল। হাত জোড় করে বলল, হে দয়াময় আল্লাহ, আমি জানি তুমিই আমাকে সাহায্য করার জন্য সোনার মোহর ভর্তি এই কলসীটা আমাকে দিয়েছ। এই টাকা দিয়ে এখন আমি ভালভাবেই আমার স্ত্রীর দাফন ও দোয়া অনুষ্ঠান করতে পারব।মাটি খোঁড়া বাদ দিয়ে বুড়ো ঘড়া নিয়ে বাড়ী ফিরল। টাকা থাকলে সবই সহজ হয়ে যায়। বুড়োর বেলাতেও তাই হল। খুব ভাল করে কবর খুঁড়ে বুড়িকে কবরস্থ করা হল। এই শ্রাদ্ধোৎসবে যারা এসেছিল, তাদের মনোমত সুস্বাদু খাবার দিয়ে আপ্যায়িত করা হল। একাজে সাহায্য করার জন্য এবার অনেক বন্ধুই এগিয়ে এল। বুড়ো আবার সেই শয়তান পুরোহিতের কাছে গেল। পুরোহিত যেই আগের মত টাকার জন্য খিঁচিয়ে উঠেছে, অমনি বুড়ো কোন কথা না বলে একটা মোহর গুঁজে দিল। মোহর দেখে পুরোহিতের চোখ তো ছানাবড়া। তার আর আপত্তি করার কারণ নেই। সেও খুশীমনে দোয়া অনুষ্ঠান করতে এগিয়ে এল। সেদিন সে এমনভাবে দোয়া ও ধর্মিয় শ্লোক পড়েছিল, যেরকম সে হয়তো আর কোনদিনও করেনি। তা ছাড়া খাওয়ার আয়োজন দেখে তার তো আর বাক্য সরেনা। উৎকৃষ্ট মাছ, মাংস, শরবত কি নেই সেখানে! পেট পুরে তিনজনের খাবার সে একলাই খেয়ে ফেলল।কিন্তু পুরোহিতের মনে খট্‌কা লাগল। এটা কি করে হল? যে লোকটার কাছে তার বৌকে কবর দেবার জন্য একটা কানাকড়িও ছিল না, হঠাৎ সে এত টাকা কোথা থেকে পেল? সব কিছু জানার জন্য তার মন খুবই উতলা হচ্ছিল, কিন্তু সে ঘাপ্‌টি মেরে সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগল। সবার সামনে এসব টাকা পয়সার কথা বলা উচিত নয়। কিছুক্ষণ পর বুড়োর বাড়ির সব লোকজন চলে গেলে সে বুড়োকে ডাকল। কড়া গলায় চোখ পাকিয়ে বলল, হ্যাঁরে, এত টাকা তুই কোথায় পেয়েছিশ? আমায় সব কথা খুলে বল্‌ তো দেখি। জানিস্‌ তো, আমাকে বলা মানে আল্লাহকে বলা? তুই যদি আমার কাছে অর্থাৎ আল্লাহর কাছে কোন কথা লুকোস্‌ বা মিথ্যা বলিস, তবে সেটা কিন্তু সাংঘাতিক পাপ হবে।বুড়ো খুবই সরল ছিল। কিছুই গোপন করতে পারে না। সে পুঙ্খানুপুঙ্খ সব কিছু পুরোহিতকে খুলে বলল। শুনে পুরোহিত মুখে কিছু বলল না বটে, কিন্তু তার অন্তর ঈর্ষায় জ্বলে যেতে লাগল।বাড়ি ফিরে সে তার বৌকে সব ঘটনা খুলে বলল। তার বৌ-এর স্বভাবও তারই মত। এসব শুনে সে তক্ষুনি তার স্বামীর সঙ্গে বসে গেল কি ভাবে সেই টাকাগুলি আত্মসাৎ করা যায়, তার জন্য ষড়যন্ত্র করতে। কিছু পর পুরোহিত একটা মতলব ঠিক করল। তাদের খ্রিষ্টীয় ধর্মমত অনুযায়ী শয়তানের গায়ে থাকে একটা ছাগলের চামড়া, মুখে ছাগলের দাড়ি এবং মাথায় ছাগলের শিং। সে বৌকে জিজ্ঞাসা করল, আমাদের একটা ছাগল ছিল না? বৌ বলল, হ্যাঁ, আছে তো। কি হবে সেটা দিয়ে? সেটাকে ভিতরে নিয়ে আয় তো, বলে পুরোহিত তার সমস্ত পরিকল্পনা বৌকে খুলে বলল।ছাগলটাকে এনে সেটাকে দুজনে মিলে কেটে ফেলল। তারপর তার চামড়াটা পশুটার গা থেকে খুলে নিজে পড়ল। এরপর ছাগলের শিং আর দাড়িটাও নিজের মুখে এঁটে নিল। এইভাবে সে নিজেকে শয়তানের মত করে সাজিয়ে তুলল।মধ্যরাতে এই সাজে পুরোহিত গেল বুড়ো লোকটার বাড়িতে। সে শিং দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। এত রাতে দরজায় ধাক্কা আর আঁচড়ানোর শব্দ শুনে বুড়ো একটু অবাক হয়ে গেল। সে একটু গলা তুলে জিজ্ঞাসা করল, কে ডাকে?”“আমি শয়তান।বুড়ো তো ভয়ের চোটে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর নাম জপতে শুরু করল। শুনতে পেয়ে পুরোহিত গলা মোটা করে বলল, ওসব আল্লা-টাল্লার(আল্লাহর) নামটাম করে কোন লাভ হবে না। জগতের কেউ-ই আমার থেকে তোকে বাঁচাতে পারবে না। তোর অত্যন্ত দুরবস্থা দেখে, তোর জন্য আমি মাটির তলায় এক ঘড়া মোহর পুঁতে রেখেছিলাম। সেটা তুলে এনে তুই তোর স্ত্রীর শ্রাদ্ধশান্তি সব তো খুব ধূমধামের সঙ্গেই করলি দেখলাম। কিন্তু সব টাকা তো খরচ হয়নি। তবে বাকি টাকাটা এখন ফেরৎ দিচ্ছিস না কেন? শিগ্‌গির টাকাগুলো ফেরৎ দে বলছি, নইলে কিন্তু তোমার ঘোর বিপদ হবে।ঘরের মধ্যে ঠক্‌ঠক্‌ করে কাঁপতে কাঁপতে বুড়ো ভাবতে লাগল, আগে যখন আমার কাছে কোন টাকাপয়সা ছিল না, তখনও আমরা দুজন কোনরকমে খেয়েপরে থেকেছি। আর আজ তো আমি একলা, টাকাগুলো ফেরৎ দিলে আর বেশি খারাপ কি হবে? আমি ঠিক চালিয়ে নেব। বাইরে কে দাঁড়িয়ে আছে দেখবার জন্য সে জানলা দিয়ে উঁকি দিল। দেখল, গায়ে ছাগলের চামড়া, মাথায় ছাগলের শিং, আবার দাড়িও রয়েছে, এরকম একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। ওরে বাবা, এইরকম চেহারা? এ শয়তান না হয়ে যায় না মনে হতেই বুড়ো প্রায় অজ্ঞান হয়ে যায় আরকি! সন্তর্পণে সে দরজা একটুকু ফাঁক করে টাকার ঘড়াটা বাইরে ছুঁড়ে দিয়ে দড়াম্‌ করে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। একবারও উকি দিয়ে দেখল না সত্যিই কে ঘড়াটা নিয়ে গেল।আর বাইরে হল কি? এত সহজে কার্যসিদ্ধি হতে দেখে পুরোহিত তো খ্যাঁ খ্যাঁ করে হেসে গড়িয়ে পড়ল। দারুণ আনন্দে দুটো ডিগবাজিই দিয়ে দিল সেখানে। তারপর ঘড়াটা নিয়ে লাফাতে লাফাতে বাড়ির দিকে রওনা হল।বাড়ি এসে শোবার ঘরের মেঝেতে যখন সে পুরো ঘড়াটা উপুর করে দিল, সারা মেঝেতে সোনার মোহর ঝর্‌ঝরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। তাই দেখে পুরোহিতের কি উল্লাস! সে একবার মোহরগুলির উপর গড়াগড়ি দিচ্ছে, আবার দুহাত দিয়ে মোহরগুলি তুলছে, ফেলছে, কি যে করছে, কেন করছে কিছুরই কোন মানে নেই। তার স্ত্রীও এসে তার মাতামাতিতে যোগ দিল। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে সে তার স্ত্রীকে বলল ছাগলের চামড়াটা খুলে দিতে। কিন্তু কী আশ্চর্য বলতো! অনেক টানাটানি করেও চামড়াটা তার গা থেকে খোলা গেল না। শুধু তাই নয়, ছাগলের শিংটাও, দেখা গেল, আট্‌কে গেছে। না পেরে স্ত্রী শেষ পর্যন্ত রান্নাঘর থেকে মাংস কাটার ছুরি নিয়ে এল। সেটা দিয়ে কাটতে গিয়ে পুরোহিতের শরীর চিরে রক্ত ঝরতে লাগল। সে যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগল; কিন্তু কিছুতেই তার গা থেকে সেই চামড়া বা শিং খোলা গেল না।ছেলেমেয়েরা, ভাবতো, পুরোহিতের কি দশা? সারা জীবন সে যে লোকের সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করেছে, আজ যে সে বুড়োকে এইভাবে ঠকাল, এর ফলেই কি সে সত্যিসত্যিই শয়তান হয়ে গেল?(রুশ-উপকথা থেকে ভাবানুবাদ)

Sunday, February 7, 2016

The Snail and the Bee - শামুক আর মৌমাছি



The Snail and the Bee - শামুক আর মৌমাছি
কোন একদিন এক রানী মৌমাছি তার দলবল নিয়ে মধুর সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সজোরে ভোঁ ভোঁ করে শব্দ করে উড়তে উড়তে তারা এসে পড়ল এক বড় শামুকের বাড়ির কাছে।তাদের দেখে মা শামুক ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বলল আমার বাচ্চারা বাড়িতে ঘুমাচ্ছে। তারা এখনও বড় হয় নি।  তাদের আরো পনেরো দিন ঘুমানোর দরকার, ভালো ভাবে হাটতে হলে। তোমরা এরকম  কানফাটানো আওয়াজ করলে তারা ঘুমায়  কি করে? গতকাল তোমার বাড়ির মৌমাছি গুলো তাদের বন্ধুবান্ধব নিয়ে এসে সারাদিন এখানে ছিল আর খুব হট্টগোল করেছে। আজ আবার তুমি এসে বিরক্ত করছো। এই ভয়ংকর আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে যদি আমার কোন ছেলেমেয়ে মরে  তাহলে আমি গিয়ে তোমাদের গোটা বাড়ি ভেঙ্গে দিব। তোমাদের কোথাও থাকার জায়গা থাকবে না তখন। তোমরা কি জানো যে এই গাছটা কিন্তু আমার নিজের। আমার মালিক বিশ বছর আগে আমাদের জন্যে এই গাছটা লাগিয়েছিল, যাতে এর ফল খেয়ে আমরা বাচতে পারি। কিন্তু প্রত্যেক বছরই যখন গাছে ফুল ফোটে তখনই তোমরা এসে সব মধু চুরি করে খেয়ে চলে যাও। তার ওপর সারাক্ষন বিশ্রী  শব্দ করে আমাদের বিরক্ত করো। এক্ষুনি যদি তোমরা এখান থেকে না ভাগো,নতুবা আমি আমার মালিক আর আমার বাড়ির লোকদের ডাকবো। তখন রানী মৌমাছি বলল তোমরা তো জন্মেছো ধূলো আর নোংরা থেকে। তোমার কোন মালিক নেই। বাড়িতে অন্য কোন লোকজনও নেই। কোন কালে তোমার পূর্বপুরুষরা সবাই মারা গেছে। তাও কোন মানুষ গ্রাহ্য করনি। কারন এই বিশাল পৃথিবীতে তোমরা কারো কাজে লাগ না। কিন্তু আমরা হলাম মৌমাছি। আমাদের তৈরী মধু খেয়ে মানুষরা ভালো থাকে, শরীরে বল পায়, স্বাস্থ্য ভালো হয়। মধু ওষুধের থেকেও উপকারী। মৌমাছিরা সারা পৃথিবীর সব জায়গায় আছে। সমগ্র মানবজাতি আমাদের ভালোবাসে। তাই আমাদের জন্যে তারা ফুল গাছ লাগায়। তোমরা কি মনে করো তোমরা মানুষের থেকেও উঁচু দরের কোন প্রানী? একটা গল্প বলি শোন। একদিন একটা দুষ্টু ছেলে আমাদের বাড়ি ভেঙ্গে দিতে এসেছিল। কিন্তু তার মা তাকে বলল তুমি অনেক কিছু ভেঙ্গে নষ্ট করো। কিন্তু খবরদার মৌমাছির বাসায় হাত দিও না। ওরা সারাদিন কত পরিশ্রম করে আমাদের জন্যে মধু সংগ্রহ করে। কোন রানী মৌমাছিকে যদি তুমি মেরে ফেল তাহলে তার সব ছেলেমেয়েরা আমাদের ছেড়ে চলে যাবে। তখন শীতকালে আমরা রুটি দিয়ে খাওয়ার মতো একটুও মধু পাবো না। তখন ছেলেটা মায়ের কথা শুনে এখান থেকে চলে গেল। সে পাখি ধরতে পারে, মাছ ধরতে পারে, ফুল ছিঁড়তে পারে, যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। কিন্তু আমাদেরকে কক্ষনো বিরক্ত করবে না কারন আমরা খুব উপকারী প্রানী। তোমরা কী? তোমরা সারাদিন শুধু শম্বুক গতিতে চলাফেরা করো, কারো কোন কাজে লাগো না। মা শামুক এই শুনে খুব রেগে গেল। সে বাড়িতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের বলল শোন সবাই। মৌমাছিরা আমাদের শত্রু। পনেরো দিন পরে তোমরা হাঁটতে শিখে যাবে। তখন তোমাদের মধ্যে পাঁচজন মৌমাছিদের বাড়ি গিয়ে ওদের মৌচাকটা ভেঙ্গে দিয়ে আসবে।’  দেখতে দেখতে পনেরো দিন কেটে গেল। মা শামুকের ছেলেমেয়েরা হাঁটতে শিখে গেল। তখন তাদের মধ্যে পাঁচজন শামুক মৌচাক ভাঙ্গা অভিযানে বেরলো। হাঁটতে হাঁটতে তারা যখন মৌচাকের কাছে গিয়ে পৌঁছল তখন ঘরে কোন মৌমাছি ছিল না। সব মৌমাছি মধু সংগ্রহে বেরিয়েছে। তাই দেখে শামুকরা ভারি খুশি হল। বলল চলো আমরা এখন যত পারি মধু খাই। সন্ধ্যের আগে পর্যন্ত তারা মধু খেয়েই চলল। এপাশে সন্ধ্যে হতেই সব মৌমাছিরা দলবেঁধে গান গাইতে গাইতে নাচতে নাচতে বাজনা বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরে এলো। এসেই ঐ পাঁচটা শামুককে দেখতে পেয়ে খুব অবাক হল তারা। রানী মৌমাছি বলল তোমরা এখানে কেন এসেছ? আর কেনই বা আমাদের সব মধু খেয়ে নিচ্ছ? এটা তোমাদের বাড়ি নয় আর এই মধুও তোমাদের খাবার নয়। এখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। তোমাদের বাড়ি ফিরে যেতে অসুবিধে হতে পারে। তাই আজকের রাত্রিটা আমি তোমাদের এখানে থাকতে দিতে পারি। কিন্তু তোমাদের কথা দিতে হবে যে ছোট্ট মৌমাছিদের তোমরা কোন ক্ষতি করবে না। পাঁচটা শামুকের মধ্যে যে সব থেকে বড় ছিল সে হেসে উত্তর দিল তোমাদের মধুটা খেতে খুব ভালো। আমরা সপরিবারে এখানে চলে এসেছি। শুধু একটা বা দুটো রাত নয়। আমরা এখন থেকে বরাবরের জন্যে এখানেই থাকব। আর যতদিন না সব মধু শেষ হয়ে যায় ততদিন আমরা এই মধুই খেয়ে যাব। রানী মৌমাছি বলল শুধু একটা রাত্রি আমি তোমাদের থাকতে দিতে পারি। কোনভাবেই সারাজীবন তোমরা এখানে বসবাস করতে পারনা। তাছাড়া তোমরা কোন ভালো কাজ করেও আমাদের সাহায্য করতে পারবে না। এখন তো তোমাদের একটা রাত্রি এখানে থাকতে দিতেও আমার চিন্তা হচ্ছে। যখন আমরা ঘুমাবো তখন হয়তো মৌচাকের সব মধু তোমরা খেয়ে শেষ করে ফেলবে বা আমার ছেলেমেয়েদের মেরে ফেলবে। চিন্তিত মুখে রানী মৌমাছি ওখান থেকে চলে গেল। তারপর বৃদ্ধ জ্ঞানী মৌমাছিদের ডেকে বলল আজ রাত্রে তোমরা ঘুমিয়ো না। আমি ঐ শামুকগুলোকে বিশ্বাস করতে পারছি না। পরদিন সকালে জ্ঞানী মৌমাছিরা রানী মৌমাছিকে এসে জানালো মোট পঁয়ত্রিশটা শিশু মৌমাছি কাল রাত্রে মারা গেছে। শামুকগুলো আমাদের সব ঘরে ঢুকে সারা রাত ঘুরে বেড়িয়েছে। সব মধুতে মুখের নোংরা লাগিয়ে দিয়েছে। সব মধু বিষাক্ত করে দিয়েছে। এই বিষাক্ত মধু খেলে মানুষরা ও মারা যেতে পারে। মহামান্য রানী, আমাদের উচিত এক্ষুনি ওদেরকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া। রানী মৌমাছি বলল আমরা আর একদিন দেখবো। এর মধ্যে ওরা স্বেচ্ছায় চলে না গেলে আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেব। তারপর রানী মৌমাছি গেল শামুকদের সঙ্গে কথা বলতে। বন্ধুগন, তোমাদের বেশ সাস্থ্যবান দেখাচ্ছে। আমি জানি তোমরা এখানে বেশ মনের আনন্দে রয়েছ। এখানকার মধুও তোমাদের খুব সুস্বাদু লেগেছে। কিন্তু তোমরা আমাদের ঘরে থাকা শিশু মৌমাছিদের মেরে ফেললে কেন? আর কেনই বা আমাদের সব মধু নষ্ট করে দিয়েছ? শামুকরা কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। আমার মনে হয় আমি জানি কেন এটা করেছ তোমরা। আমার বিশ্বাস তোমরা আমাদের শত্রু। কিছুদিন আগে এক মা শামুকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল যে আমাদের খুব বকাঝকা করেছিল। সে নিশ্চয় তোমাদের মা। সে যাই হোক। আমি এখন যা বলছি তা মন দিয়ে শোন। কাল দুপুরের মধ্যে যদি তোমরা এই বাড়ি ছেড়ে না চলে যাও তাহলে তোমরা সবাই এখানেই মারা যাবে। দুষ্টু ও অহংকারী শামুকের দল তাচ্ছিল্যের সুরে বলল তোমাদের যা ইচ্ছে তাই করো। আমরা এখানেই থাকবো। আমরা স্বাধীন। আমাদের যেখানে ইচ্ছে করে সেখানে যাবো, যা ভালো লাগবে তাই খাবো। এখন আমাদের এই মৌচাকের মধু খেতে ভালো লাগছে, তাই আমাদের ইচ্ছে হলে সব মধু আমরা খেয়ে শেষ করে দেব। মোটকথা আমরা এখান থেকে নড়ব না। এখানেই থাকব। দেখি তোমরা কী করতে পারো। তখন রানী মৌমাছি খুব গম্ভীর হয়ে গেল। সে তার সেনাবাহিনীকে ডেকে পাঠালো। তাদের বলল তোমরা সবাই যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। কাল দুপুর পর্যন্ত সব মোম প্রস্তুত করে রাখো। তরবারিতে ধার দিয়ে তৈরী থাকো যুদ্ধের জন্যে। সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর মধ্যে সাজো সাজো রব পড়ে গেল। হুলই তাদের তরবারি। হাজার হাজার সেনা মৌমাছি তাদের হূল শানিয়ে অপেক্ষা করে রইল। পরদিন দুপুর বেলা শামুকরা কেউ মৌচাক ছেড়ে গেলনা। তাই দেখে রানী মৌমাছি যুদ্ধ শুরুর আদেশ দিল। সবাই রন হুংকার দিতে শুরু করো। দরকার পড়লে হুল ফুটিয়ে শামুকদের মেরে ফেলবে। আদেশ পেয়েই সেনা মৌমাছিরা ভয়ংকর জোরে ভোঁভোঁ আওয়াজ করে রন হুঙ্কার দিতে শুরু করল। শামুকরা সেই আওয়াজ শুনে ভয় পেয়ে যে যার নিজেদের খোলের মধ্যে গুটিয়ে ঢুকে গেল। তখন রানী আদেশ দিল মোম আনো জলদি। কিছু সেনা মৌমাছি আওয়াজ করে ওদের ভয় দেখিয়ে চলল। আর কিছু মৌমাছি মোম নিয়ে এসে ওদের মুখের কাছে ঢেলে দিয়ে মুখটা পুরো বন্ধ করে দিলো। দু ঘন্টার মধ্যে শামুক গুলোর এমন অবস্থা হল যে তারা না পারল একটুও নড়াচড়া করতে, না পারল নিঃশ্বাস নিতে। তখন রানী মৌমাছি সব শামুকদের উদ্দেশ্যে বলল আমি প্রথমে ভেবেছিলাম যে তোমরা আমাদের বন্ধু। তাই তোমাদের রাত্রে থাকতে দিয়েছিলাম, পেট ভরে মধু খেতে দিয়েছিলাম। কিন্তু তোমরা ভেবেছ আল্লাহ এই গোটা পৃথিবীটা শুধু তোমাদের একার জন্যেই বানিয়েছেন। তোমরা ছাড়া আর কেউ সেখানে থাকতে পারবে না। তোমাদের এতো নীচু মন। তোমরা যদি এরকম ক্ষুদ্র ও দুর্বল প্রানী না হয়ে কোন পাখি বা জন্তুর মতো বড় ও শক্তিশালী প্রানী হতে তাহলে এই পৃথিবীতে আর অন্য কোন প্রানীরই স্থান হত না। এত করে বলা স্বত্ত্বেও এখান থেকে চলে যেতে রাজী হলে না, এখন এখানেই মরো। এটাই তোমাদের যোগ্য শাস্তি। তারপর রানী সব মৌমাছিদের নিয়ে আবার একটা নতুন মৌচাক তৈরী করল ও সেখানেই বসবাস করতে থাকল। একদিন মৌমাছিদের মালিক এলো মধু নিতে। সে দেখল মৌচাকে কোন মৌমাছি নেই, শুধু পাঁচটা মরা শামুক পড়ে আছে। মালিক সববুঝতে পারল। বলল এই মৌচাকের মধু বিষাক্ত। এটা কে ভালো করে পরিস্কার করতে হবে। এই বলে সে সব বিষাক্ত মধু আর মরা শামুকদের মাটিতে ফেলে দিলো। মৌমাছিরা বহাল তবিয়তে সুখে শান্তিতে বেঁচে রইল ও মানুষের উপকার করতে থাকল।

Saturday, February 6, 2016

Dream of Red Throat Crane - লালকন্ঠের স্বপ্ন





Dream of Red Throat Crane - 
লালকন্ঠের স্বপ্ন
লালকন্ঠ সারসের মন মেজাজ বেজায় খারাপ। সেই শীতের শুরুতে যখন উত্তুরে হাওয়া বইতে শুরু করেছে একটু একটু করে, আর তার দুধ সাদা পালকের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝেই কনকনিয়ে দিচ্ছে শরীর, তখন সাত-তাড়াতাড়ি করে উড়ে চলে এল দক্ষিনে। দক্ষিনের দিকে শীত কম, রোদ্দুর বেশি। লালকন্ঠ প্রত্যেকবারই শীতে উড়ে আসে দক্ষিন দিকে। এটাই তো নিয়ম। কোন কোন বার কোন দলের সঙ্গে, কখনো আবার একা। আবার শীত শেষ হলে উড়ে যায় উত্তরে। তখন আবার দক্ষিনে বড় বেশী গরম।প্রত্যেকবারের মত, এবারো লালকন্ঠ এসে নেমেছে পূবদিকের এক মস্ত বড় শহরের চিড়িয়াখানায়। তার যে সব বন্ধুরা সাথে উড়ছিল, তারা অবশ্য আরো খানিকটা এগিয়ে নামবে অন্য একটা বড় ঝিলে। কিন্তু লালকন্ঠের এই চিড়িয়াখানাটাই পছন্দ। মাঝখানে একটা ছোটখাটো ঝিল আছে। সেখানে অন্যান্য দেশ থেকে উড়ে আসা আরো পাখিদের সাথে দেখা হয়। উপরি পাওনা অন্যান্য জন্তুরা।

গতবছর হাতি জেনির একটা ছোট বাচ্চা হতে দেখে গেছিল। একবছরে নিশ্চয় অনেকটা বড় হয়ে গেছে। চিড়িয়াখানার হরিণদের সাথে লালকন্ঠের ভালো আলাপ আছে। নানারকম হরিণের মধ্যে বুড়ো  হরিণ আইজ্যাকের সাথে লালকন্ঠের ভালো বন্ধুত্ব। দুজনে বসে নানারকম সুখ-দুঃখের গল্প হয়। আইজ্যাকের জন্ম হয়েছিল এই চিড়িয়াখানাতেই। সত্যিকারের জঙ্গল, খোলা মাঠ বা বিশাল নদী, কিছুই দেখেনি সে। তাই লালকন্ঠের কাছ থেকে দেশ বিদেশের গল্প শুনতে ভালবাসে সে। দুজনে সারা দুপুর রোদের ওমে ঘুরে -ফিরে বকর বকর করে, মাঝে মাঝে বিষ্ণুর বরাদ্দ ছোলাও খায় লালকন্ঠ।এইসব ভেবেই এবারো অন্য সঙ্গীদের ছেড়ে এখানে নেমে পড়া। কিন্তু নেমেই মন খারাপ হয়ে আছে। চিড়িয়াখানার দিকে আর তাকানো যায়না। চারদিক ধুলোয় ধুলোময়, অপরিচ্ছন্ন। মাঝে অত সুন্দর ঝিল, যার পাড়ে খাবার খুঁজতে খুঁজতে বিদেশী পাখিদের সাথে কাটিয়ে দেওয়া যেত সারা দুপুর, মাঝে মাঝে গোসল ও করা যেত, সেটা ঢেকে আছে শ্যাওলায়। সব থেকে নোংরা হয়ে আছে খাঁচাগুলির মাঝে মাঝে ছড়িয়ে থাকা খোলা লন এবং মাঠ। কাগজের টুকরো, পলিথিনের প্যাকেট, খালি জলের বোতল, সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারিদিকে। এত নোংরা কারোর ভালো লাগে !! মানুষগুলো যেন কিরকম। এদিকে তো নিজেরা দিব্বি ঝকঝকে নতুন পোষাক পড়ে ঘুরছে বেড়াচ্ছে, খাচ্ছে, খেলছেএই চিড়িয়াখানা তো ওদেরি জন্য। অথচ, দেখো, একবার নিজেদের জিনিষ কে সুন্দর রাখার কোন চেষ্টাই নেই। একেই তো শহরের হাওয়ায় এত ধুলো-ময়লা যে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। একটু উড়লেই দম নিতে কষ্ট হয়। তার ওপর যদি থাকার জায়গাটা এত খারাপ হয়, তাহলে কারো মন -মেজাজ ঠিক থাকে?লালকন্ঠের সঙ্গীরা এই অবস্থার খবর আগেই পেয়ে গেছিল। তাই ওরা আর এখানে নামেনি। ওদের মধ্যে কেউ কেউ তো আরো দক্ষিনে সেই সুন্দরবনে চলে যাবে। ওরা তো তাকে মানা ও করেছিল। কিন্তু সে-ই কোন কথা না শুনে নেমে পড়ল।এবার অন্য দেশ থেকেও এখানে অনেক কম পাখী এসেছে। কয়েকবছর আগে অবধি জলের ধারের ঘাসজমিতে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যেত না। খাবার নিয়ে মাঝে মাঝে ঝগড়া লেগে যেত। এবার তো কেউ আসেই নি। লালকন্ঠ গুনে দেখেছে জনা পনেরো মত বিদেশী অতিথি আছে।ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে আইজ্যাকের  সঙ্গে এইসব নিয়েই কথা হচ্ছিল লালকন্ঠের। সকালের নরম রোদে বেশ আরাম আরাম লাগছেকিন্তু গা ঝাড়া দিয়ে উঠল লালকন্ঠ। এখনো চিড়িয়াখানার দরজা খোলা হয়নি। এই সময়টা এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো যায়। যখন চিড়িয়াখানায় ভিড় হয়ে যায়, তখন সে ঝিলের ঘেরা নীচু পাঁচিলের ভেতরেই ঘোরাফেরা করে। জেনির মেয়েকে একবার দেখে এলে হয়। খুব মজাদার হয়েছে বাচ্চাটা। ওদের থাকার খোলা জায়গাটায় মায়ের সাথে সাথে ঘুরে বেড়ায়। ছোট্ট শূঁড় দিয়ে একটা পুরোনো গাছের গুঁড়িকে ঠেলার চেষ্টা করে। বড় বড় পা ফেলে, খানিক উড়ে, খানিক হেঁটে, হাতিদের ঘেরা মাঠের দিকে পা বাড়াল লালকন্ঠ। যাওয়ার পথে পড়ল জিরাফের থাকার জায়গা। ঘেরা জায়গার মধ্যে বড় গাছটার পাতা ভেঙ্গে , বউ-বাচ্চা নিয়ে জিরাফ জোসেফ সকালবেলার জলখাবার খাচ্ছে। দাঁড়িয়ে একটু কুশল বিনিময় হল দুজনের। জোসেফ একটু চুপচাপ থাকে। তবে মন ভালো থাকলে ওর কাছ থেকে ভালো ভালো গল্প শুনতে পাওয়া যায়। সেই কোন দূর মহাদেশ আফ্রিকা থেকে কাঠের বাক্সে বন্দী করে ওকে নিয়ে এসেছিল এখানে। ওর পরে এসেছে ওর সঙ্গিনী জিল। ওদের একটা তুরতুরে বাচ্চা হয়েছে। সেই ছোট্ট জনি এখনো বাবার মত লম্বা হয়নি, তাই তার মা উঁচু ডাল থেকে পাতা ভেঙ্গে ভেঙ্গে তাকে খেতে দিচ্ছে।সাদা বাঘ রাজার খাঁচার সামনে গিয়ে দাঁড়াল লালকন্ঠ। এক বছর আগেও রাজাকে ছোট ছেলেই বলা যেত। কিন্তু এখন রাজার চেহারা বিশাল একদম বড়সড় হয়ে গেছে সে। খুব রাগিও হয়েছে। খাঁচায় বন্দি থাকতে একদম ভালো লাগে না তার। পাশের খাচার বুড়ো বাঘ প্রিয়াম-এর কাছ থেকে সুন্দরবনের গল্প শুনেছে সে। তাই সে সুন্দরবনে যেতে চায়, যেখানে বাঘেরা স্বাধীন। রাজার চালে খাঁচার পরিসরের ভিতর পায়চারি করছে । লালকন্ঠকে দেখে বড় বড় চোখে তাকালো একবার। তারপর ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে আবার উল্টোদিকে চলে গেল। লালকন্ঠ আর দাঁড়াল ণা। কে জানে বাবা, কোনদিন বাগে পেলে হয়ত তার ঘাড়েই না হালুম করে এসে পড়ে! জেনির সাথে দেখা করে ফেরার পথে দুটো কাজ আছে। আসার পথে দেখে এসেছে, ফেজ্যান্ট আরুশার সঙ্গে খাঁচায় এক নতুন পাখী। কি তার রূপ ! কালচে লাল ভেলভেটের মত মসৃন পালকে ঢাকা শরীর,।গলার কাছে গোল করে লাল-হলুদ কলারের মত পালকের আস্তরন। দেখলে মনে হয় ঠিক যেন রানীর মত পোষাক পড়ে আছে। আরুশা বলল মোটে দুই দিন হল এসেছে, তাই খুব মুষড়ে পড়ে আছে। ওর সঙ্গে একটু গল্প করে আসতে হবে। আসলে এত সুন্দরী পাখি দেখে লালকন্ঠের একটু ভাব করতে ইচ্ছা হয়েছে। আবার ময়ুর নীলাদ্রি সুন্দর বলে তার খুব অহংকার, কারোর সঙ্গে ভালো করে কথাই বলে না! লালকন্ঠকে তো পাত্তাই দেয় না। একদিন বলেছিল কি বিচ্ছিরি লম্বা লম্বা পা ! আচ্ছা, এতে লালকন্ঠর কি করার আছে? আল্লাহ যদি তাকে এইরকম করে গড়ে তোলেন! লালকন্ঠ কিছু বলে না। সে তো জানে, সে অন্য অনেক সারসের থেকে লম্বায় অনেক বড়,তার ডানায় কত জোর!!এই নতুন নাম না জানা পাখি, যে নাকি পৃথিবীর অন্য প্রান্তের দক্ষিণ  আমেরিকা থেকে এখানে এসেছে, সে নিশ্চয় নীলাদ্রি ময়ূরের মত হবেনা।ওদিকে আবার গতকাল দুপুরবেলায় শিম্পাঞ্জি বিগ বি এক কান্ড ঘটিয়েছে। ওকে দেখতে এসে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ওর দিকে কলা, বাদাম এইসব ছুঁড়ে দিচ্ছিল। বিগ বি ও দিব্বি বসে বসে খাচ্ছিল। এমন সময় একটা লোক আচমকা বিগ বি-এর দিকে একটা ঢিল ছুঁড়ে মারে। কেন যে মারল!!মানুষগুলোর কি মাথায় কোন বুদ্ধি নেই। বিগ বির মাথায় ভালোই লেগেছিল। তাই  বিগ বি উলটো রেগে গিয়ে সেই পাথরটাই ছুঁড়ে মারে বাইরের দিকে। পাথরটা গিয়ে সোজা লাগে একটা ছোট্ট মেয়ের কপালে। কপাল ফেটে রক্তও বেরোয়। বিগ বিও খুব ঘাবড়ে গেছিল। পরিখার পাশ থেকে অনেক দূরে এক কোনায় চলে গিয়ে বসে ছিল বাকি দিনটা। ওকে অবশ্য চিড়িয়াখানার ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। কিন্তু বেচারা গতকাল থেকে খুবই মন খারাপ করে বসে আছে। বার বার বলছে ও আসলে ওই ছোট্ট মেয়েটাকে আঘাত করতে চায়নিওর সঙ্গেও দেখা করা দরকার। ব্যথাটা কমল কিনা কে জানে!!মাঝে মাঝে নিজেকে ভাগ্যবানই মনে করে লালকন্ঠ। সে চিড়িয়াখানায় বন্দী নয়। ইচ্ছামত দেশ-বিদেশে ঘুরতে পারে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে খাবার জিনিষ সব সময় পাওয়া যায়না। আজকাল তো বিস্তীর্ণ মাঠ বা জলা জায়গা খুঁজে বার করাই অসাধ্য হয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু উঁচু উঁচু গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে ওঠা মানুষদের থাকার বাড়ি। শীতে উড়ে আসতে হয় এদিকে, গ্রীষ্মে আবার ফিরতে হয় উত্তরে। অবশ্য লালকন্ঠের প্রজাতির সব সারসই যে উড়ে আসে দক্ষিনে , তা নয়। অনেকেই আসে না। কিন্তু লালকন্ঠ আসে। তার ভালো লাগে আসতে। শীত ও একটু কম লাগে। তবে খাল বিলের ধারই বলো, বা তার উড়ে আসার পথ, সবেই আছে নানারকম বিপদ। সবসময় হুঁশিয়ার থাকতে হয়। কিন্তু তাও, সব মিলিয়ে দেখতে গেলে লালকন্ঠ ভালোই আছে। অন্তঃত ঘুরে ফিরে সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ ও তো হয়। বাঘ, সিংহ থেকে জেব্রা, হরিণ, হাতি, এমনকি, পুঁচকে খরগোশগুলোর সঙ্গেও তার ভাব।.শীত শেষ হয়ে আসে। বাতাসের শিরশিরানি কেটে গিয়ে দক্ষিন দিক থেকে ভেসে আসে নরম গরম দখিনা হাওয়া। রোদের উষ্ণতা বাড়তে থাকে। লালকন্ঠ বুঝতে পারে এবার ফিরে যাওয়ার দিন এল আবার সেই উত্তরে। এই কদিনে চিড়িয়াখানার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। দলে দলে মানুষ এসেছে, পশুপাখিদের দেখেছে, মাঠে বসে খাওয়াদাওয়া করেছে, আর ফেলে রেখে গেছে আরো আবর্জনা। বাতাসময় ধুলো আর শুকনো পাতার সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে পলিথিনের ব্যাগ। বুড়ি সিংহি জেজেবেল তো রীতিমত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এর পরের বার আর এখানে আসা যাবেনা ভাবে লালকন্ঠ। খুঁজে নিতে হবে অন্য কোন জায়গা, যেখানে হয়ত দেখা হয়ে যাবে সাইবেরিয়ার পুরোনো বন্ধুদের সাথে। আগামি কালই ভোর ভোর বেড়িয়ে পরবে সে।আইজ্যাকের ছোলায় ভাগ বসাতে বসাতে লালকন্ঠ দেখতে পেল একটা ছোট মেয়ে, তার পরনে সবুজ পোষাক, হাতে একটা থলি, সে সামনের মাঠ থেকে কি সব কুড়োচ্ছে। ভালো করে দেখার জন্য কাঁটাতারের বেড়ার কাছে চলে আসে লালকন্ঠ। তারপরেই অবাক হয়ে যায়আরে!! একটা নয়, বেশ অনেক ছোট ছোট মেয়ে আর ছেলে, সবুজ পোষাক পড়ে, হাতে থলি নিয়ে মাঠের মধ্যে রয়েছে। তারা মাঠ থেকে নোংরা কাগজ, খাবারের প্যাকেট, এইসব তুলে তুলে তাদের থলিতে জমা করছে। কেউ কেউ আবার পাইপ দিয়ে জল ছিটিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে আশেপাশের গাছপালাগুলো। ওদের সঙ্গে রয়েছে চিড়িয়াখানার কর্মীরাও। তারা পরিষ্কার করছে পরিখাগুলির জল।দেখতে দেখতে কয়েক ঘন্টার মধ্যে অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে উঠল চিড়িয়াখানার চত্বর। লালকন্ঠ এইসবের মধ্যেই অনেকের সঙ্গে কথা বলে এসেছে। বিগ বি বেশ খুশি তার পরিখার জলটা পরিষ্কার করে দেওয়ায়। এতদিন সে ভালো করে নিজের মুখটাও দেখতে পাচ্ছিল না!! মুনিয়া পাখি গুলি নিজেদের মধ্যে এত কলরবলর করছে যে ওদের সঙ্গে কথাই বলা গেলনা। গম্ভীর পন্ডিত ধনেশ পাখি অবশ্য মুখ বেঁকিয়ে বলেছে দেখো কতদিন পরিষ্কার থাকে!! তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছে প্যাঁচালো গলা পেলিক্যান গুলো। বিজ্ঞ বিজ্ঞ গলায় বলেছে এইসব এই একদিনই হবে!! ওদের থেকে ভালো শান্ত -শিষ্ট হরিণেরা। তারা একবাক্যে জানিয়েছে তাদের ব্যপারটা বেশ পছন্দ হয়েছে তাও তো কিছু মানুষের টনক নড়েছে!!ইতিমধ্যে চিড়িয়াখানার দরজা খুলে গেছে। ক্রমে ক্রমে বাড়ছে মানুষের ভীড়। লালকণ্ঠ দেখলো সেই সবুজ পোষাক পরা ছোটরা সবাইকে বোঝাচ্ছে পরিবেশ কে পরিষ্কার রাখতে। কেউ ভুল করে ঠোঙ্গা বা জলের বোতল মাঠে ফেললে, তার সঙ্গে কথা বলে তাকে দিয়ে সেই জিনিষ বড় বড় ময়লা ফেলার পাত্রে জমা করাচ্ছে।দিনের শেষে একটা বড় গাড়ি করে যখন সব ময়লা তুলে নিয়ে চলে গেল, তখন বেশ খুশি খুশি মন নিয়ে লালকন্ঠ ঘুমাতে গেল। ভাবল, কালকেও কি এমনি হবে? নাকি, ধনেশ পন্ডিত আর প্যাঁচালো পেলিক্যান গুলোর কথাই সত্যি হবে?পরের দিন সকালে কিন্তু ওরা আবার এল। একই রকম পোষাক পরা অন্য আরো একদল ছেলেমেয়েতার পরের দিন ও এলকাকাতুয়া বাক্যবাগীশ লালকন্ঠকে খবর দিল যে এরকম নাকি রোজই হবে। বকবকে কাকাতুয়ার বন্ধু শহুরে কাকের দল, যারা সারা শহরময় ঘুরে বেড়ায় আর সব্বার হাঁড়ির খবর রাখে, তারাই জানিয়েছে একথা। প্রতিদিনই একদল করে শিশু আসবে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের চিড়িয়াখানা পরিষ্কার রাখার জন্য।আরো কিছুদিন পরে এক হালকা কুয়াশামাখা ভোরবেলায় লালকন্ঠ তার বিশাল দুটি ডানা ছড়িয়ে ভেসে উঠল আকাশে। পূবের আকাশ লাল করে তখন সবে সূর্যদেব উঠেছেন। সেই লাল- সোনালি নরম আলোয় ঝকঝকে সুন্দর চিড়িয়াখানাকে পেছনে ফেলে নীল আকাশে উড়ে চলল লালকন্ঠ। এবার সে নিশ্চিন্ত। তার বন্ধুরা আর ধুলো ময়লার মধ্যে থাকবে না। আর আগামি বছর সে আবার ফিরে আসবে এখানে। লালকন্ঠ নিশ্চিত, আগামি বছরও এসে সে তার চিড়িয়াখানাকে একইরকম দেখতে পাবে ঝকঝকে, পরিষ্কার, প্রানের আনন্দে ভরপুর তার পরিযায়ী জীবনের ছোট্ট এক স্বপ্।

 (বিদেশী গল্প থেকে অনুবাদকৃত)


Popular Posts